প্রকাশ: ৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। প্রতিদিন শত শত কন্টেইনার এবং কাঁচামাল খালাসের মাধ্যমে সচল থাকে দেশের চাকা। কিন্তু এই বন্দরের অভ্যন্তরেই বর্তমানে এক বিষাদময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়ে রীতিমতো বিপাকে পড়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমস হাউস। শত কোটি টাকা মূল্যের ৩০৪টি বিলাসবহুল গাড়ি এখন কেবল লোহালক্কড়ের স্তূপে পরিণত হয়েছে। আধুনিক কারশেডের ভেতরে সারি সারি পড়ে থাকা গাড়িগুলো আজ ধুলায় মলিন, ইঞ্জিন অকেজো এবং যন্ত্রাংশ খসে পড়ছে। বছরের পর বছর আইনি জটিলতায় আটকে থাকায় এই গাড়িগুলো বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য এখন এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ২৫০টি গাড়ি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি আধুনিক কারশেড এখন অনেকটা পরিত্যক্ত ডাম্পিং স্টেশনের রূপ নিয়েছে। কারশেডের ভেতরে বর্তমানে ৬০৩টি গাড়ি রয়েছে, যার মধ্যে ৩০৪টি গাড়ি দীর্ঘ সময় ধরে ফেলে রাখার ফলে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ গাড়ির টায়ার ফেটে মেঝেতে বসে গেছে, বডিতে ধরেছে মরচে এবং অন্দরমহল পরিণত হয়েছে পোকামাকড়ের আবাসস্থলে। বছরের পর বছর অলস পড়ে থাকায় কোটি কোটি টাকার এই সম্পদ এখন শুধুই জঞ্জাল। নতুন আমদানি হওয়া ঝকঝকে গাড়িগুলোকে কারশেডের ভেতরে জায়গা না দিতে পেরে বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে, যার ফলে রোদ-বৃষ্টিতে সেগুলোরও স্থায়িত্ব কমছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, এখানে ১০ থেকে ১৫ বছরের পুরোনো গাড়ি পড়ে আছে, যেগুলোর কোনোটিরই আর রাস্তায় চলার সক্ষমতা নেই। আধুনিক ও সুরক্ষিত কারশেডটি মূলত নতুন আমদানিকৃত গাড়ির জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সেগুলোর যন্ত্রাংশ ভালো থাকে। কিন্তু জরাজীর্ণ গাড়িগুলো জায়গা দখল করে রাখায় নতুন গাড়িগুলোকে খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে, যা আমদানিকারক ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। বন্দর কর্তৃপক্ষ বহুবার এসব গাড়ি অপসারণের চেষ্টা করলেও আইনি বেড়াজাল তা হতে দিচ্ছে না।
কাস্টমস হাউসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিআরটিএ কর্তৃক চলাচলের অযোগ্য ঘোষিত ১৮২টি গাড়ির মধ্যে ৭৪টি গাড়ি স্ক্র্যাপ হিসেবে কেটে কেজি দরে বিক্রি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বাকি ১০৮টি গাড়ির ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন চলমান থাকায় সেগুলোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া আরও ৮৭টি গাড়ি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, আমাদের কাজের সীমাবদ্ধতা হলো উচ্চ আদালতের নির্দেশনা। কোনো গাড়ি নিয়ে আইনি লড়াই বা মামলা বিচারাধীন থাকলে তা নিলাম করা বা ধ্বংস করা আইনত সম্ভব নয়। ফলে আইনি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব গাড়িকে বন্দরের কারশেডেই বন্দি থাকতে হচ্ছে।
আমদানিকৃত এসব গাড়ির প্রতিটি একসময় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা মূল্যের ছিল। সেই হিসাবে বর্তমানে বন্দরের কারশেডজুড়ে পড়ে থাকা গাড়ির মোট বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই গাড়িগুলো বন্দরে পড়ে থাকলেও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে এসব গাড়ি খালাস না করেই দায় সেরেছে। আমদানিকৃত গাড়ি বন্দর থেকে ৩০ দিনের মধ্যে খালাস করার স্পষ্ট নিয়ম থাকলেও, কেন দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এসব গাড়ি বন্দরে ফেলে রাখা হলো এবং কেনই বা পরবর্তীতে মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ল, তা এক বড় রহস্য।
ব্যবসায়ী মহলের মতে, বন্দরের এই অব্যবস্থাপনা রোধে সরকারি নীতিমালা আরও যুগোপযোগী হওয়া জরুরি। পিএইচপি অটোমোবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকতার পারভেজ বলেন, বন্দরে গাড়ি নষ্ট হতে দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সমস্যার সমাধানে একাধিক পথ খোলা আছে। কর্তৃপক্ষ স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাড়িগুলো ছেড়ে দিতে পারে, যাতে ক্রেতারা এগুলো স্ক্র্যাপ বা অন্যান্য শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া কর্তৃপক্ষ নিজেরাই স্ক্র্যাপ বা ধ্বংসের উদ্যোগ নিতে পারে, যা জায়গা খালি করবে এবং পরিবেশ দূষণ কমাবে। তবে আইনি জটিলতার কারণে এসব উদ্যোগ বারবার থমকে যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ৩০৪টি গাড়ি চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কাস্টমস নিলামে বিক্রি করতে পারছে না, অন্যদিকে আইনি জটিলতায় ধ্বংসও করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন এই ভাঙাচোরা গাড়িগুলো কারশেডের মূল্যবান জায়গা দখল করে রাখায় নতুন আমদানিকৃত গাড়িগুলো রোদে পুড়ে নষ্ট হচ্ছে। এটি কেবল বন্দরেরই ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েও এক বিশাল আর্থিক লোকসান। সরকারি নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত একটি সমন্বিত আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই জট খুলে বন্দরের কারশেডগুলোকে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা।
পরিশেষে, বন্দরের আধুনিক অবকাঠামোয় লোহালক্কড়ের স্তূপের এই দৃশ্য যেন আমাদের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি টাকার সম্পদ যখন চোখের সামনে নষ্ট হয়, তখন তার দায়ভার কেবল আমদানিকারক বা বন্দর কর্তৃপক্ষ নেয় না, বরং তা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের সম্পদের ক্ষতি হিসেবেই গণ্য হয়। দ্রুত উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই শত কোটি টাকার জঞ্জাল পরিষ্কার করার এখনই সময়। অন্যথায়, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।