ইউক্রেনকে ৭০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তায় ন্যাটো

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
ইউক্রেনকে ৭০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তায় ন্যাটো

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অস্থির সময়ে ন্যাটোর পরবর্তী কৌশল ও পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল বিরাজ করছে। আগামী ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে বিশ্বের দৃষ্টি এখন তুরস্কের দিকে। এই সম্মেলনে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের পথে এগোচ্ছে সামরিক জোটটি। সম্প্রতি ন্যাটো রাষ্ট্রদূতদের দ্বারা অনুমোদিত এবং রয়টার্সের পর্যালোচনায় আসা এক খসড়া ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, ইউক্রেনকে বিশাল অঙ্কের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতে যাচ্ছে ন্যাটো। এই খসড়া অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইউক্রেনকে ৭০ বিলিয়ন ইউরো সামরিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে জোটটির। শুধু তাই নয়, ২০২৭ সালেও অন্তত এই সমপরিমাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

ন্যাটোর এই ঘোষণাপত্রটি কার্যকর করার জন্য এখন শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতাদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের চলমান সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে ন্যাটোর এই সহায়তা কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও নৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো যে তাদের যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতি অটল এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর, এই বিশাল অঙ্কের অনুদান তারই একটি বলিষ্ঠ প্রমাণ।

ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, জোটের একজন সদস্য দেশের ওপর হামলা হওয়া মানেই পুরো জোটের ওপর হামলা। এই নীতিটিই ন্যাটোর মূল ভিত্তি এবং আঙ্কারা সম্মেলনে নেতারা তাদের এই অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিগত দিনগুলোতে বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটোর ব্যয় ও ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনামূলক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে এই শীর্ষ সম্মেলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী নেতা যখন ইউরোপের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তখন ন্যাটোর অস্তিত্ব ও ঐক্য নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তবে আঙ্কারা সম্মেলনের এই খসড়া ঘোষণাপত্রটি প্রমাণ করছে যে, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩২টি সদস্য দেশ আবারও যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে একাট্টা হয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলো এবং কানাডা এই জোটের নিরাপত্তায় আগের চেয়ে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছে। ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, একটি শক্তিশালী ন্যাটোর মাধ্যমেই ইউরোপকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা সম্ভব। এই ঐক্য কেবল ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত প্রয়াস। রাশিয়ার সামরিক প্রভাব ও সম্প্রসারণবাদকে রুখতে পশ্চিমা বিশ্বের এই কৌশলগত বিনিয়োগ ও ঐক্যের বার্তা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

ইউক্রেন সহায়তার পাশাপাশি আঙ্কারা সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও খসড়া ঘোষণাপত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ন্যাটো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ইরানের হাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে কঠোর অবস্থান রয়েছে, ন্যাটো তাতে আবারও সমর্থন জানিয়েছে। একইভাবে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হওয়ায় সেখানে যেকোনো ধরনের বাধা বা উস্কানি বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তাই সেখানে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ন্যাটো।

এই শীর্ষ সম্মেলনটি মূলত এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন পুরো পৃথিবী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি ও খাদ্যের সংকট, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা—এই সবকিছুর মাঝে ন্যাটোর এই আঙ্কারা সম্মেলন একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। সদস্য দেশগুলোর এই ঐক্য প্রমাণ করে যে, সংকট যত গভীরই হোক না কেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের অভিন্ন লক্ষ্য ও আদর্শের জায়গা থেকে নড়বে না। ইউরোপের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ইউক্রেনের জয় বা পরাজয়কে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং ন্যাটো এখন কোনোভাবেই এই বিষয়ে আপস করতে রাজি নয়।

পরিশেষে বলা যায়, আঙ্কারা সম্মেলন কেবল একটি নিয়মিত বৈঠক নয়, বরং এটি ন্যাটোর নতুন করে পথচলার একটি দৃঢ় ঘোষণা। ইউক্রেনের জন্য ৭০ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তা প্যাকেজ রাশিয়ার জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। এটি একইসঙ্গে ইউক্রেনীয় জনগণের সাহস ও লড়াইয়ের প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সমর্থন। ন্যাটো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কোনো কার্পণ্য করতে রাজি নয়। বিশ্ববাসী এখন অপেক্ষা করছে আগামী ৭ ও ৮ জুলাইয়ের সেই সম্মেলনের ফলাফলের জন্য, যেখানে বিশ্বনেতাদের নেওয়া এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো আগামী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করে দেবে। ন্যাটোর এই পদক্ষেপ বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কতটা সুসংহত করতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত