জাপানি মোটরসাইকেলের দাপটে বাংলাদেশের বাজার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
জাপানি মোটরসাইকেলের দাপটে বাংলাদেশের বাজার

প্রকাশ:  ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় মোটরসাইকেল এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত সহজ করতে এবং সময়ের সাশ্রয় করতে মোটরসাইকেলের ভূমিকা অপরিসীম। বিগত কয়েক বছরের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোটরসাইকেলের বাজারে এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও, বর্তমানে সেই স্থান দখল করে নিয়েছে জাপানি মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, জাপানি তিনটি প্রধান ব্র্যান্ড—ইয়ামাহা, সুজুকি ও হোন্ডা—দেশের মোট বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা মোটরসাইকেল শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক চিত্রকে সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোটরসাইকেল বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার ইউনিটের কাছাকাছি। যদিও এই সংখ্যা আগের অর্থবছরের বিক্রির সাথে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, তথাপি বাজারের অভ্যন্তরে শক্তির ভারসাম্য যে পরিবর্তিত হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। জাপানি এই তিন ব্র্যান্ড সম্মিলিতভাবে গত অর্থবছরে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৩০০টিরও বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের মোট মোটরসাইকেল বাজারের ৬৪ শতাংশ। এই তিন কোম্পানির বিক্রির প্রবৃদ্ধিও অত্যন্ত লক্ষণীয়, কারণ তারা দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে সামগ্রিক বাজারে বিক্রির গতি অনেকটাই স্থবির।

জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাসের মতে, জাপানি মোটরসাইকেলের ওপর মানুষের আস্থা বেড়েছে মূলত তাদের গুণগত মান, বিক্রয়োত্তর সেবা, নিরাপত্তা এবং পুনর্বিক্রয়ের সময় ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনার কারণে। বর্তমান সময়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এই বাস্তবতায় জাপানি মোটরসাইকেলগুলোর মাইলেজ বা জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষমতা ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইয়ামাহার মতো ব্র্যান্ডগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে তাদের উন্নত প্রযুক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্সের প্রতিশ্রুতি মূল ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল শিল্পের বিকাশে ২০১৮ সালে প্রবর্তিত মোটরসাইকেল শিল্পোন্নয়ন নীতি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। এই নীতির আওতায় সরকারিভাবে এমন শুল্ক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়, যা দেশে কারখানা স্থাপনে উদ্যোক্তাদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছিল। ফলে দেশে বর্তমানে ১১টিরও বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে, যেগুলোর অধিকাংশই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে কাজ করছে। এই কারখানাগুলোতে সংযোজন ও উৎপাদনের ফলে মোটরসাইকেলের উৎপাদন খরচ কমে এসেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের মধ্যে এসেছে বাহনটি। তথ্যমতে, ২০১৫ সালে দেশে ২ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হতো, যা ২০২২ সালে ৬ লাখের মাইলফলক স্পর্শ করেছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে বিক্রির গতি কিছুটা ধীর হয়েছে, তবুও স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ায় বাজারটি তার সম্ভাবনা ধরে রেখেছে।

ব্র্যান্ডভিত্তিক বিক্রির চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এসিআই মোটরসের মাধ্যমে ইয়ামাহা বাংলাদেশের বাজারে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। ২০১৬ সালে যখন এসিআই মোটরস ইয়ামাহার পরিবেশক হিসেবে যাত্রা শুরু করে, তখন দেশে বার্ষিক ৫ হাজার ইয়ামাহা মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। ২০১৮ সালে স্থানীয়ভাবে কারখানা স্থাপনের পর থেকে ইয়ামাহার বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে এবং সর্বশেষ অর্থবছরে তারা সাড়ে ৯৫ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে। এই অর্জন ইয়ামাহার বৈশ্বিক পরিবেশকদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশের মোটরসাইকেল বাজারে ইয়ামাহার হিস্যা ২৩ শতাংশ। একইভাবে, জাপানি ব্র্যান্ড সুজুকিও তাদের সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে। র‌্যাংগস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান র‌্যাংকন মোটরবাইকস তাদের কারখানা থেকে গত অর্থবছরে ৯০ হাজারের বেশি সুজুকি মোটরসাইকেল বাজারে সরবরাহ করেছে, যা মোট বাজারের ২১ শতাংশ। অন্যদিকে, জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে মুন্সিগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত কারখানা থেকে গত অর্থবছরে ৮৩ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল বাজারে এসেছে, যাদের হিস্যা ২০ শতাংশ।

তবে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর এই জয়যাত্রার মাঝেও ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলো তাদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে হিরো মোটরসাইকেল গত অর্থবছরে প্রায় ৭৪ হাজার ইউনিট বিক্রি করে ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। হিরোর স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশের সিইও বিজয় কুমার মণ্ডলের দাবি অনুযায়ী, তাদের অভ্যন্তরীণ হিসাবে বিক্রির পরিমাণ ৯০ হাজারের বেশি এবং তারা জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। বাজাজ, রয়েল এনফিল্ড এবং টিভিএসের মতো অন্যান্য ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলোও বাজারে তাদের কার্যক্রম জোরালোভাবে পরিচালনা করছে।

নতুন অর্থবছরের দিকে তাকালে মোটরসাইকেলের বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক ও সতর্ক উভয় ধরনের পূর্বাভাসই পাওয়া যাচ্ছে। কারখানা থেকে ডিলার বা শোরুম পর্যায়ে মোটরসাইকেল সরবরাহের পরিমাণ বা লিফটিং গত অর্থবছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি ছিল, যা নির্দেশ করে যে কোম্পানিগুলো আসন্ন চাহিদার বিষয়ে আশাবাদী। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা কিছু চ্যালেঞ্জের বিষয়েও সতর্ক করে দিচ্ছেন। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল কেনা এবং নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে টিআইএন বা কর শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করার সরকারি সিদ্ধান্ত। এই নীতির ফলে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা বা স্থবিরতা তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়ে কোম্পানিগুলো চিন্তিত। এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিজয় কুমার মণ্ডলের মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে মোটরসাইকেলের বিক্রি অবশ্যই বাড়বে, কিন্তু নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব কী হবে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে, মোটরসাইকেলের বাজার এখন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে জাপানি ব্র্যান্ডগুলো তাদের গুণগত উৎকর্ষ ও বিক্রয়োত্তর সেবার মাধ্যমে ভোক্তাদের হৃদয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত