সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারকে শেষ শ্রদ্ধা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, বিশিষ্ট আইনজীবী ও প্রবীণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক শোকবার্তায় বর্তমান স্পিকার মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের দীর্ঘ অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁর কর্মময় জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১২ জুলাই রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী সমাজ এবং সংসদীয় পরিমণ্ডলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে তিনি সততা, প্রজ্ঞা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন।

শোকবার্তায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং সাংবিধানিক প্রজ্ঞা জাতীয় সংসদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং পরিবারের সদস্যদের এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি কামনা করেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জন্ম ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে আইন বিষয়ে আরও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যে যান। ১৯৬১ সালে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের আইনজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার পথ সুদৃঢ় করেন।

দেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন বিচক্ষণ, মার্জিত এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল একজন ব্যক্তিত্ব।

আইন পেশার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় নিজের অবস্থান থেকে অবদান রাখেন। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন ছিল রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, সংসদীয় রীতি-নীতি অনুসরণ এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও সংসদের কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে স্পিকারের পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদে দায়িত্ব পালনকালে নিরপেক্ষতা, প্রজ্ঞা এবং সাংবিধানিক জ্ঞানের সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও আইনি দক্ষতার মাধ্যমে এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যায়িত হয়ে আসছে। সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণে গুরুত্ব দিতেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পক্ষে ছিলেন।

তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন মহল থেকে শোক ও সমবেদনা জানানো হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকেও তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করা হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি আইন, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন। দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার তাঁকে সমসাময়িক অনেকের কাছেই বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষী ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংসদীয় গণতন্ত্রের বিভিন্ন ধাপ এবং সাংবিধানিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু তরুণ আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিলেন। আইন ও রাজনীতির সমন্বিত অভিজ্ঞতার কারণে তিনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ মতামতের জন্যও পরিচিত ছিলেন।

দেশের বিচারব্যবস্থা এবং সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান ভবিষ্যতেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনজ্ঞ হিসেবে তাঁর দক্ষতা যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর সংযম, ধৈর্য এবং সাংবিধানিক দায়িত্ববোধও সমানভাবে আলোচিত হয়েছে। তাঁর কর্মজীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যু দেশের জন্য এক যুগের অবসানের প্রতীক বলেও অনেকেই মনে করছেন। দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দীর জীবনে তিনি শিক্ষা, আইন, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যে অবদান রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে মূল্যায়িত হবে দীর্ঘদিন। বর্তমান স্পিকারের শোকবার্তাও সেই অবদানের স্বীকৃতিই বহন করে। তাঁর কর্ম, প্রজ্ঞা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com