জামায়াত ফেরেশতার দল নয়, ভুল হলে সংশোধন: শফিকুর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
জামায়াত ফেরেশতার দল নয়, ভুল হলে সংশোধন: শফিকুর

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াত কোনো ফেরেশতার সংগঠন নয়; এটি মানুষের সংগঠন। ফলে ব্যক্তিগত ভুল-ত্রুটি হওয়ার সুযোগ থাকলেও নৈতিকতার প্রশ্নে দল কোনো ধরনের আপস করবে না। কেউ ভুল করলে তাকে অবশ্যই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের আওতায় আসতে হবে। একই সঙ্গে তিনি দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জনআস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে চাইলে ব্যক্তিগত আচরণ, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ঢাকা জেলা জামায়াতে ইসলামীর ষাণ্মাসিক সদস্য (রুকন) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য গাজী মো. নজরুল ইসলামকে ঘিরে আলোচিত ভিডিওকাণ্ড নিয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করলেও বক্তব্যের বিভিন্ন অংশে দলীয় শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি শুধু সাংগঠনিক বিস্তারে নয়, বরং তার নৈতিক অবস্থান ও জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড যদি দলের আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী হয়, তাহলে সেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তিনি বলেন, মানুষের ভুল হতে পারে, কিন্তু ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া বা আড়াল করার সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, জামায়াতের সমালোচনা করতে কেউ ভয় পাবেন না। যারা দেশকে ভালোবাসেন, সমাজের কল্যাণ চান এবং অন্যায় বা অনিয়ম দেখেন, তারা তা তুলে ধরুন। দল গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানায়। কোনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মসমালোচনা এবং ভুল সংশোধনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি একটি রূপক উদাহরণ টেনে বলেন, সাদা কাপড়ে সামান্য দাগও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। যারা জনজীবনে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন, তাদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। একজন রাজনৈতিক কর্মীর আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে দলের ভাবমূর্তি তুলে ধরে। তাই ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই সততা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।

তিনি বলেন, জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি শুধু বক্তব্য নয়, বাস্তব আচরণের ভিত্তিতেই আস্থা গড়ে তোলে। সেই কারণে দলের প্রতিটি নেতাকর্মীর উচিত এমনভাবে দায়িত্ব পালন করা, যাতে সংগঠনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং জনগণের বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হয়।

সম্মেলনে আঞ্চলিক রাজনীতি ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে বিশ্বাস করে না। একইভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও অন্য কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। তবে সীমান্তে অস্থিতিশীলতা বা উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব উভয় দেশকেই বহন করতে হয়। তাই সীমান্ত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারে, যখন সেখানে সব ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করতে পারেন। তিনি নেতা ও নীতির সংশোধনের মাধ্যমে সমাজে প্রকৃত শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

সরকারের সংবিধান ও গণভোটসংক্রান্ত অবস্থান নিয়েও সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, সংবিধান নিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেশের জন্য ইতিবাচক নয়। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন জরুরি।

সম্মেলনে তিনি সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, আদর্শিক চর্চা এবং নতুন প্রজন্মকে নৈতিক নেতৃত্বে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াত চায় দায়িত্বশীল, সৎ এবং জনকল্যাণমুখী নেতৃত্ব তৈরি করতে। সে জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আত্মসমালোচনা এবং সাংগঠনিক মূল্যবোধের চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা জেলা জামায়াতের আমির মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন। এতে বক্তব্য দেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুলসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা। বক্তারা সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় শৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং জবাবদিহির বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ধরনের বক্তব্য দলীয় কর্মীদের প্রতি বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি জনমতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে দলীয় সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং নৈতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নের ওপর।

জামায়াতের এই সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যকে দলীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নৈতিকতা, আত্মসমালোচনা, শৃঙ্খলা এবং জনআস্থার বিষয়গুলোকে সামনে এনে দলীয় নেতাকর্মীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত