প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির দাবি, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তার আর কোনো সাংবিধানিক দায়মুক্তি নেই। ফলে দায়িত্ব পালনকালীন তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে এনসিপি বলেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোকে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। এ সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং পরবর্তী আইনগত করণীয় নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
আখতার হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রে অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পুরো বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে তাকে একটি ‘সেফ এক্সিট’ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়।
তার ভাষায়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব ছাড়ার পর আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। তিনি বলেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং যে কারও বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। এ কারণেই তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। দলটির মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করেন দলটির নেতারা।
আখতার হোসেন আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে যেসব প্রাণহানি ও ঘটনাপ্রবাহ ঘটেছে, সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত। তার দাবি, কোনো ব্যক্তি তার সাংবিধানিক পদমর্যাদার কারণে বিচার থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে আইনানুগ প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, এতদিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকায় সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। কিন্তু পদত্যাগের পর সেই পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে বলে এনসিপির অভিমত। এখন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং অভিযোগগুলো তদন্তের ব্যবস্থা করা।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির নেতারা আরও বলেন, তারা প্রতিশোধমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। বরং আইন, সংবিধান এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন বলেও তারা মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরছে। কেউ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, আবার কেউ দায়িত্ব পালনকালীন সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইনগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সাবেক রাষ্ট্রীয় পদধারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে সেটি আইন ও সংবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। অভিযোগের সত্যতা, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনায় নিয়েই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ধরনের বিষয়ে আদালত এবং তদন্ত সংস্থার স্বাধীন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনসিপির সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমীন, যুগ্ম সদস্যসচিব আকরাম হুসাইন, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসউদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা দলীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং সমতার নীতি নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য।
এদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে উত্থাপিত এই দাবি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে। তদন্ত ও বিচার সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত দেশের প্রচলিত আইন, সংবিধান এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।