অভিবাসন ব্যয়ের লাগাম টানতে কবে কার্যকর উদ্যোগ?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৪ বার
অভিবাসন ব্যয়ের লাগাম টানতে কবে কার্যকর উদ্যোগ?

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিবছর লাখো কর্মী উন্নত জীবনের আশায় মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার আগেই তাদের বড় একটি অংশকে পড়তে হয় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের চাপে। সরকারি নির্ধারিত ব্যয় এবং বাস্তবে আদায় করা অর্থের মধ্যে বিশাল ব্যবধান থাকায় কর্মীদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে বিদেশে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, ভিসা-বাণিজ্য, দুর্বল তদারকি এবং অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে অভিবাসন ব্যয় বছর বছর বাড়লেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনো দৃশ্যমান নয়।

সরকার প্রায় এক দশক আগে বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর জন্য সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করেছিল। ২০১৬ সালে সৌদি আরব এবং ২০১৭ সালে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, লিবিয়া, রাশিয়া, ব্রুনাই, মালদ্বীপ, মিসর, ইরাক ও লেবাননসহ বিভিন্ন দেশের জন্য পৃথক ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ওই সময় সার্ভিস চার্জ, বিমান ভাড়া, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বিবেচনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে বিদেশগামী কর্মীদের। ফলে কাগজে-কলমে ব্যয় নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যয়ের তালিকা হালনাগাদ না হওয়া, নিয়মিত তদারকির অভাব এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক ভিসা-বাণিজ্যের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রবাসে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া অনেক কর্মীর গল্পই একই ধরনের। সুনামগঞ্জের বাসিন্দা রিসান আহমদ ২০২৪ সালের শেষ দিকে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাতারে যান। আত্মীয়ের মাধ্যমে ভিসা সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় করেন। পরে বিমান ভাড়া, চিকিৎসা পরীক্ষা, কাগজপত্র এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে তাকে পারিবারিক কৃষিজমি বিক্রি করতে হয়েছে, পাশাপাশি ঋণও নিতে হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও তিনি এখনো মোট ব্যয়ের বড় অংশ তুলতে পারেননি।

রিসানের ভাষ্য, সরকার যে ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়েছে, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। তিনি মনে করেন, এক দশক আগের নির্ধারিত হার বর্তমান বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, আবার সেই হারও বাস্তবে কার্যকর করা হচ্ছে না।

সৌদি আরবপ্রবাসী রবিউল আলমের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। তিনি জানান, প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় করে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে গেলেও শুরুতে নিয়মিত কাজ পাননি। কয়েক মাস পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরে ইকামা নবায়নের বিপুল ব্যয়, ঋণের কিস্তি এবং সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে তিনি চরম সংকটে পড়েন। শেষ পর্যন্ত বৈধ অবস্থান ধরে রাখতে না পেরে অনিয়মিত অবস্থায় কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তার দাবি, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় অনেক প্রবাসীকেই এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ‘কস্ট অব মাইগ্রেশন’ গবেষণায়ও বাংলাদেশের উদ্বেগজনক অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের গড় অভিবাসন ব্যয় ছিল প্রায় তিন লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখ ১৭ হাজার টাকা এবং ২০২৪ সালে পৌঁছে চার লাখ ৬৩ হাজার টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অভিবাসন ব্যয় প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশে যাওয়ার জন্য ব্যয় করা অর্থ তুলতে একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের গড়ে ১০ দশমিক ২ মাস সময় লাগে। তুলনামূলকভাবে ফিলিপাইন, ঘানা, লাওস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা মালদ্বীপের শ্রমিকদের এই ব্যয় তুলতে অনেক কম সময় প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে বাংলাদেশ থেকে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অভিবাসন নিশ্চিত করতে এখনো বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মনে করেন, সরকার নির্ধারিত ব্যয়সীমা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়া, প্রশাসনিক ব্যয়, বৈদেশিক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়েছে। তাই বাস্তবসম্মত ব্যয়সীমা নির্ধারণ এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজার কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ না হওয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সীমিত সুযোগের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ, ভিসা সংগ্রহ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে মধ্যস্বত্বভোগীদের সক্রিয় উপস্থিতির কারণে ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরেও অনেক অননুমোদিত দালাল কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, কেবল ব্যয়সীমা নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবতা বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য ব্যয় নির্ধারণের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সব ধরনের অর্থ লেনদেনে বাধ্যতামূলকভাবে রসিদ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে এজেন্টদের সার্ভিস চার্জ নির্দিষ্ট করে দিলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগও অনেকাংশে কমে আসবে।

তার মতে, অভিবাসন ব্যয়ের প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিক লেনদেন নথিভুক্ত করা গেলে কর্মীদের প্রতারণার ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি ভিসা-বাণিজ্য ও অবৈধ দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি।

এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ) সাইফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের জন্য নতুন করে বাস্তবসম্মত ব্যয়সীমা নির্ধারণের কাজ চলছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার আগেই যদি একজন কর্মী অতিরিক্ত ঋণের বোঝা কাঁধে নেন, তাহলে সেই চাপ দীর্ঘদিন তার ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে। অনেকেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে বছরের পর বছর কষ্টের জীবনযাপন করেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং সাশ্রয়ী অভিবাসন নিশ্চিত করতে হলে শুধু ব্যয়সীমা নির্ধারণ করলেই হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন নিশ্চিত করা, অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি এবং নতুন আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশগামী কর্মীদের আর্থিক চাপ কমবে, প্রতারণার ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং দেশের বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত