প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় এক দশক পর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এটি অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের পুনরাবৃত্তি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা বাজেট ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সরকারের অবস্থান আপাতত ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার এখনই আইএমএফের সুপারিশ মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত কৌশল নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে নবম পে স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। বৈঠকে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো একযোগে বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে, রাজস্ব ঘাটতি আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বড় আকারের পুনরাবৃত্তিমূলক সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সেই কারণেই সংস্থাটি নতুন পে স্কেল অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে। এরপর নভেম্বরে আইএমএফের আরেকটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে। ওই সফরে নতুন ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি নবম জাতীয় পে স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব, সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা এবং রাজস্ব সক্ষমতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
তবে সরকারি সূত্র বলছে, সরকার চাইছে আইএমএফের ওই বৈঠকের আগেই নবম পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে। এর ফলে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও কিছুটা দূর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নবম পে স্কেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে সচিব কমিটির সুপারিশ, সম্ভাব্য বেতন কাঠামো, বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। এতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পে স্কেল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের আরও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত সুপারিশ উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। বিশেষ করে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় কতটা বাড়বে, রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে সেই ব্যয় কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে এবং অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা আগামী সপ্তাহের কোনো এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে অনুমোদনের আগে ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার নীতিগতভাবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চায় না। তবে একবারে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্পও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে সরকারি কোষাগারের ওপর আকস্মিক চাপ কমবে এবং আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
বর্তমান অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ সময়ে দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরেই নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নবম পে স্কেল কার্যকর হলে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী এর সুবিধা পাবেন। শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও নতুন কাঠামোয় পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে এটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ সরকারের প্রতি বড় ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয় বৃদ্ধির আগে রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন পে স্কেল সময়ের দাবি। তবে একই সঙ্গে দেশের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এমন একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যাতে একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য প্রত্যাশা পূরণ হয়, অন্যদিকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, রাজস্ব নীতি এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর থাকবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের।