প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১১টায় নির্ধারিত এ বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের পরিচালক (গণসংযোগ-১) মো. মনির হোসেন সোমবার এ বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়সূচি, নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক দিক, মনোনয়নপত্র গ্রহণ, যাচাই-বাছাই, ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এবং জাতীয় সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা হতে পারে। যদিও বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এটি মূলত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অংশ।
গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দেন। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার জন্য স্পিকারের নিকট লিখিতভাবে পদত্যাগপত্র প্রদান করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পৌঁছানো হয়। এরপর থেকেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত হয়।
বর্তমানে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাঁর এই বৈঠককে একটি প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সমন্বয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সরাসরি জনগণের ভোটে অনুষ্ঠিত না হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে সম্পন্ন হয়। ফলে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় নিশ্চিত করা নির্বাচন আয়োজনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং প্রয়োজন হলে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। তবে যদি কেবল একজন বৈধ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং অন্য কোনো বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। অতীতেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একাধিকবার এভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান হওয়ায় এই পদে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিক একটি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার প্রতীক। তাই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, আজকের বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়ে কমিশন আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে এগোতে পারে। বৈঠকে সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি, ভোটার তালিকা হিসেবে জাতীয় সংসদের সদস্যদের তথ্য হালনাগাদ, মনোনয়ন গ্রহণের স্থান ও সময় এবং নির্বাচনী কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বিষয়ে সমন্বয় নিশ্চিত হওয়ার পর কমিশন প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব কেবল ভোট আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াটি যেন সংবিধান, আইন এবং প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন—এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম বা অবস্থান প্রকাশ করেনি। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সম্ভাব্য প্রার্থী বা মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে মন্তব্য করেনি। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত যথাসময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা বজায় রেখে নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে আজকের বৈঠক তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য তফসিল ঘোষণার দিকেই এখন নজর থাকবে রাজনৈতিক দল, সংসদ সদস্য, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য জাতীয় সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো নতুন সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রকাশিত হলে সে অনুযায়ী তথ্য হালনাগাদ করা হবে।