ইমাম-মুয়াজ্জিনের তালিকায় নাম তোলার নামে চাঁদাবাজি, বিএনপি নেতা অব্যাহতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৪ বার
ইমাম-মুয়াজ্জিনের তালিকায় নাম তোলার নামে চাঁদাবাজি, বিএনপি নেতা অব্যাহতি
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক পরিচয় ও পদপদবি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেওয়া এবং নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের মাঝে এবার এক নতুন চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে উত্তর জনপদের জেলা পঞ্চগড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং খাদেমদের জন্য বিশেষ সরকারি ভাতা বা আর্থিক সহায়তার একটি তালিকা তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আর এই কল্যাণমুখী উদ্যোগকে কেন্দ্র করেই একটি কুচক্রী মহলের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। মসজিদের একজন নিবেদিতপ্রাণ মুয়াজ্জিনের নাম সরকারি ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তার কাছে মোটা অঙ্কের উৎকোচ বা চাঁদা দাবি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী মুয়াজ্জিনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত নেতাকে দলীয় সকল কর্মকাণ্ড থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মোলানি পাড়া জামে মসজিদের সম্মানিত মুয়াজ্জিন এবং সানি ইমাম হিসেবে দীর্ঘ দীর্ঘ দিন ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করে আসছেন মো. হাসনুর রশিদ। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের মসজিদভিত্তিক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের সরকারি ভাতার আওতায় নিয়ে আসার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জানার পর তিনি স্থানীয় মসজিদ কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও তার দীর্ঘদিনের খিদমত ও কাজের মূল্যায়ন করে সরকারি তালিকায় তার নামটি যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর জন্য মৌখিক ও দাপ্তরিক আশ্বাস প্রদান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে পুরো প্রক্রিয়াটিতে এক অনভিপ্রেত ও কলঙ্কজনক মোড় নেয়, যখন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই মানবিক সুযোগকে দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।
অভিযোগকারী মুয়াজ্জিন মো. হাসনুর রশিদের সুনির্দিষ্ট ও জোরালো দাবি অনুযায়ী, ওই এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে যুক্ত মো. আব্দুল খালেক এবং মো. আইবুল হক নামের দুজন ব্যক্তি তার নাম সরকারি তালিকাভুক্ত করে দেওয়ার শর্ত হিসেবে প্রথমে তার কাছে ত্রিশ হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করেন। পরবর্তীতে দরকষাকষির একপর্যায়ে সেই অঙ্ক কমিয়ে দশ হাজার টাকা প্রদান করলেই তার নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে তাকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়। দেশের একজন ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ মুয়াজ্জিনের পক্ষে অনৈতিক এই অর্থ প্রদান করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ও অমানবিক হওয়ায় তিনি এই অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানান। আর তখনই ওই চক্রটি তাকে হুমকি দিয়ে জানায় যে, নির্ধারিত চাঁদার টাকা পরিশোধ না করলে তার নাম কোনো অবস্থাতেই সরকারি তালিকার জন্য বিবেচনা করা হবে না এবং তাকে মসজিদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করার পরপরই গভীর রাতে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। অভিযোগ সূত্রে আরও প্রকাশ পায় যে, অভিযুক্ত আব্দুল খালেকের পুত্র সাজ্জাদুর রহমান আকাশসহ আরও কয়েকজন ক্যাডার প্রকৃতির লোক রাত আনুমানিক একটার দিকে সরাসরি মুয়াজ্জিন হাসনুর রশিদের বাড়িতে গিয়ে চড়াও হন এবং তার জিম্মায় থাকা মসজিদের মূল চাবি জোরপূর্বক ফেরত নেন। পরবর্তীতে অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে মুয়াজ্জিনের নিজের নাম সম্পূর্ণ তালিকা থেকে কেটে বাদ দিয়ে অন্য তিন ব্যক্তির নাম ভুয়া উপায়ে তালিকাভুক্ত করে তা সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। নিজের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং অন্যায়ভাবে তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়ার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় চরম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ওই মুয়াজ্জিন। তিনি এর সঠিক প্রতিকার পাওয়ার আশায় এবং নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্যের কথা স্মরণ করে গত ৭ আগস্ট পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে তিনি এই পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
দলের একজন স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে এমন সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর চাঁদাবাজির অভিযোগ আসার পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে উপজেলা বিএনপি। অভিযোগপত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত দল গঠন করে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়। দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায় যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত দল মোলানি পাড়া এলাকায় গিয়ে স্থানীয় মুসল্লি, মসজিদ কমিটি এবং ভুক্তভোগী মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা যাচাই করেন এবং প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের শতভাগ সত্যতা খুঁজে পান। প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও দলের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে আর কোনো কালক্ষেপণ না করে গত ১০ আগস্ট অভিযুক্ত আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ হিসেবে দলীয় সকল পদ ও কর্মকাণ্ড থেকে তাকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবু দাউদ প্রধান এবং সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান বাবু উভয়ের যৌথ স্বাক্ষরে ইস্যু করা ওই অফিস আদেশে পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করা হয় যে, দলের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে আনীত লিখিত অভিযোগের সপক্ষে সরেজমিন তদন্তে প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলশ্রুতিতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও নৈতিক স্খলনের দায়ে পরবর্তী সুনির্দিষ্ট নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে দলের সকল প্রকার প্রাথমিক সদস্যপদ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হলো এবং এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়। দলের হাইকমান্ডের এই দ্রুত পদক্ষেপকে সচেতন নাগরিক সমাজ স্বাগত জানালেও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে নানা ধরনের মেরুকরণ লক্ষ করা যাচ্ছে।
এদিকে নিজ দলের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি পাওয়ার পর অভিযুক্ত বিএনপি নেতা মো. আব্দুল খালেক তার বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। সংবাদমাধ্যমকে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেন যে, তার কাছে কেবল ইমাম ও মুয়াজ্জিনের তালিকা চাওয়া হয়েছিল এবং সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি কোনো অনিয়ম করেননি। তিনি উল্টো দাবি করেন যে, পূর্বের মুয়াজ্জিন হাসনুর রশিদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও পারিবারিক কিছু ঝামেলার কারণে এলাকাবাসী এবং মসজিদ কমিটি তাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তার মতে, তাকে নির্দিষ্ট পদে নিয়োগ না দেওয়ার ক্ষোভ থেকেই ওই মুয়াজ্জিন তার বিরুদ্ধে এমন কাল্পনিক ও সাজানো অভিযোগ তুলেছেন এবং তাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বানানো হয়েছে। উভয় পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং পাল্টাপাল্টি দাবির ফলে পুরো বিষয়টি বর্তমানে পঞ্চগড়জুড়ে এক অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা এবং সরকারি অনুদান বিতরণের মতো একটি জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে এ ধরনের অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ভবিষ্যতে আরও কঠোর মনিটরিংয়ের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করে দেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত