প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অমর্যাদাকর ও অমানবিক র্যাগিংয়ের সংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলের আবাসিক কক্ষে নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর চলা নিষ্ঠুর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বর্তমানে ওই শিক্ষার্থী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন বা চরম শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শিক্ষাঙ্গনের মতো একটি পবিত্র ও নিরাপদ স্থানে এ ধরনের বর্বরোচিত ঘটনা ঘটার পর সাধারণ শিক্ষার্থীসহ দেশের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার তীব্রতা ও ব্যাপকতার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে এবং দ্রুততার সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর নাম হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের একজন নবীন শিক্ষার্থী। গত বুধবার গভীর রাতে পবিপ্রবির বিজয়-২৪ হলের কমনরুমে একদল উচ্ছৃঙ্খল সিনিয়র শিক্ষার্থীর নির্মম র্যাগিংয়ের শিকার হন তিনি। ভুক্তভোগী ও ওই রাতের প্রত্যক্ষদর্শী অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন সিনিয়র শিক্ষার্থী পরিচিত হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে বুধবার রাত সাড়ে দশটার দিকে হলের কমনরুমে বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন নবীন শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক ডেকে নিয়ে যান। কমনরুমে নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় অমানবিক মানসিক নিপীড়ন। নবীন শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে প্রথমে তাদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় এবং উচ্চস্বরে ধমকানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা আরও জানান, সিনিয়রদের পক্ষ থেকে নবীনদের উদ্দেশে চরম অশ্রাব্য ও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়, যা একজন শিক্ষার্থীর জন্য সম্পূর্ণ অবমাননাকর। পাশবিক মানসিকতার পরিচয় দিয়ে সিনিয়ররা নবীনদের মুখের সামনে সিগারেট পান করেন এবং তাদের মুখের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া ছাড়তে থাকেন। এরপর তাদের ওপর শারীরিক কসরত ও নানা শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়। নবীনদের কান ধরে দীর্ঘক্ষণ উঠবস করতে বাধ্য করা হয়। শাস্তির অংশ হিসেবে তাদের ১০০ থেকে উল্টো দিকে গণনা করতে বলা হয় এবং সামান্য গণনায় ভুল হলেই আবার শুরু থেকে পুনরায় কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করা হতো। এভাবে একটানা চলতে থাকা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে হাবিবুর রহমান হাবিব মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন এবং ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
একপর্যায়ে হাবিব তার শারীরিক চরম অসুস্থতার কথা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের হাতজোড় করে জানান। কিন্তু তার আকুতিতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে উল্টো তার ওপর আরও কড়াকড়ি ও নিপীড়ন চালানো হয়। তাকেও জোরপূর্বক গালাগাল করাসহ কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করা হয়। এই অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন আর সহ্য করতে না পেরে হাবিব কমনরুমেই সংজ্ঞাহীন বা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে অন্য দুই শিক্ষার্থী তাকে ধরে টেনেহিঁচড়ে গণরুমে নিয়ে যান। অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে রাতেই তাকে দ্রুত দুমকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষালয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর এ ধরনের পৈশাচিক নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো ক্যাম্পাসে তীব্র চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব সিনিয়র শিক্ষার্থীর দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগিং নামক এই ব্যাধি যদি এখনই কঠোরহস্তে দমন করা না হয়, তবে তা আগামী দিনগুলোতে আরও বড় কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে। অভিভাবক মহলেও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের দাবি উঠেছে।

শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা গণমাধ্যমে ও ক্যাম্পাসে জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ঘটনার পরদিন গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বিজয়-২৪ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাসুদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রক্টর অধ্যাপক আবুল বাশার খান, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক মো. আব্দুর রহিম এবং সহযোগী অধ্যাপক মো. ফয়সালকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এছাড়া সহযোগী অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলামকে এই কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিétটিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর সুপারিশ এবং সুস্পষ্ট মতামত দেওয়ারও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।