প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খাবারের দৈনন্দিন খরচ কোনো রকমে কমানো সম্ভব হলেও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বা চিকিৎসার ব্যয় কমানোর কোনো সুযোগ থাকে না। সাধারণ মানুষের জীবনে এই কঠিন বাস্তবতাই এখন এক নির্মম সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাসের একটি বড় অংশের আয় কেবল মা-বাবা কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের চিকিৎসা ও ওষুধের পেছনে ব্যয় করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা কিংবা সাধারণ পেশার মানুষরা ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সংসারের অন্য সব চাহিদা কাটছাঁট করেও কেবল চিকিৎসার খরচ মেলাতে গিয়ে চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়ছেন। এর ওপর সরকারের পক্ষ থেকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরোনো নীতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে গভীর দুশ্চিন্তা ও শঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করেছে। চিকিৎসার খরচ নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার এই আশঙ্কায় দেশের স্বাস্থ্য খাত ও সাধারণ রোগীর পরিবারগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
সাম্প্রতিক এক নীতিগত পরিবর্তনের জেরে দেশের ওষুধ খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পটপরিবর্তন ঘটতে চলেছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবং দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। যার অংশ হিসেবে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ প্রণয়ন ও গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সেই সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এর ফলে ১৯৯৪ সালের সেই পুরোনো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং তৎকালীন সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার পুরোনো ধারাতেই ফিরে যাচ্ছে দেশ। সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ প্রায় আটাত্তর থেকে উনআশি শতাংশই সাধারণ মানুষকে নিজেদের পকেট থেকে সরাসরি বহন করতে হয়। ফলে যেকোনো ধরনের চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া মানেই দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য সরাসরি নতুন বিপদের মুখোমুখি হওয়া। চিকিৎসা ও ওষুধের অতিরিক্ত খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের অসংখ্য পরিবার ইতোমধ্যে তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে ফেলেছে, অনেকে সুদে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন এবং কেউ কেউ চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকির মুখে পতিত হয়েছেন। আর্থিক অনটন ও চরম অস্বচ্ছলতার কারণে দেশের বহু মানুষ সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না কিংবা প্রেসক্রিপশনে লেখা জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকায় মাঝপথেই ওষুধ সেবন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতায় পুরোনো নীতিতে ফিরে যাওয়ার ফলে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর হাতে দাম নিয়ন্ত্রণের বাড়তি সুযোগ চলে যেতে পারে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
১৯৮২ সালে দেশে প্রথম জাতীয় ওষুধনীতি প্রণীত হওয়ার পর ১৫০টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের নীতিতে সেই সংখ্যা কমিয়ে ১১৭টিতে নামিয়ে আনা হয় এবং তালিকার বাইরের অধিকাংশ ওষুধের মূল্য নির্ধারণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে সেই ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আদালতের নির্দেশনা ও সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে ২০২৫ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে ২৯৭টিতে উন্নীত করা হয় এবং নতুন করে ১৭৮টি অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধ এই তালিকায় যুক্ত করা হয়। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে একে দেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ এই নতুন নীতি ও তালিকা নিয়ে তীব্র আপত্তি ও অসন্তোষ জানিয়ে আসছিল।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, পূর্বের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত নীতিমালাটি যথাযথ আলোচনা বা অংশীজনদের মতামত ছাড়াই একপেশেভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যার ফলে দেশের ওষুধ শিল্পে এক ধরনের অনভিপ্রেত স্থবিরতা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় সেই পুরোনো নীতিমালা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে ঔষধ শিল্প সমিতির নেতারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, এর মাধ্যমে শিল্প খাতের সেই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কেটে যাবে এবং বাজারে স্বাভাবিক গতিশীলতা ও স্বস্তি ফিরে আসবে। তাদের দাবি, পুরোনো নীতিতে ফিরে গেলেও সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ওষুধ পেতে কোনো বাধা থাকবে না এবং বাজারে কৃত্রিম দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ তৈরি হবে না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, দেশের নিরাপদ, কার্যকর ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সঠিক পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ সাপেক্ষে নতুন করে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হবে।

জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সরকারের এই আশ্বাসের পরেও সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তাদের মতে, প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে এবং যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ৩২ বছর আগের পুরোনো আইনে ফিরে যাওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। ১৯৯৪ সালের তৈরি করা সেই তালিকার অনেক ওষুধ বর্তমানে পুরোপুরি অকার্যকর বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, আবার অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে কিছু কিছু ওষুধ উৎপাদনের প্রকৃত খরচও অনেক হ্রাস পেয়েছে। তাই পুরো যুগান্তকারী প্রক্রিয়াটি একবারে বাতিল করে না দিয়ে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ নীতি পরিমার্জন ও সংশোধন করা উচিত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, নীতি এমনভাবে প্রণয়ন করা দরকার যাতে একদিকে ওষুধ প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ীরা বাজারে টিকে থাকতে পারেন এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমার মধ্যেই জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যথায় এই বহুমুখী সংকটের কোনো স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়ায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে না এবং শেষ পর্যন্ত এর চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হবে দেশের সাধারণ অসহায় রোগীদেরই।