শিক্ষকদের সম্মানহানি ও বঞ্চনার কালো অধ্যায়: ইউএসটিসিতে গেস্ট স্কলারদের সঙ্গে প্রতারণা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫
  • ১০২ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগাং (ইউএসটিসি)-কে ঘিরে চাঞ্চল্যকর এক অভিযোগ উঠে এসেছে, যা বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব, মর্যাদা ও নৈতিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আগত শিক্ষক ও বিদেশি স্কলারদের সঙ্গে ইউএসটিসির এমন আচরণ চরম নিন্দনীয়, অনৈতিক এবং শিক্ষার মূল আদর্শের পরিপন্থী বলে শিক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ একাধিক খ্যাতিমান শিক্ষক ও গবেষককে আমন্ত্রণ জানায় খণ্ডকালীন অধ্যাপনা, সেমিনার ও গবেষণায় অংশ নেওয়ার জন্য। কেউ এসেছিলেন বুয়েট, চুয়েট বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আবার কেউ নিজ পকেটের অর্থে কানাডা থেকে। কারও হাতে ছিল সম্মানির চুক্তিপত্র, কেউ নির্ভর করেছিলেন মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর। কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ করার পর, অনেকে শুধু বেতন থেকে বঞ্চিত হননি—কেউ কেউ চাকরি হারিয়েছেন অপমানজনকভাবে, আবার কাউকে দেওয়া হয়েছে অতীতের বেতন ফেরতের ভয়াবহ নির্দেশ।

কমপক্ষে ১১ জন শিক্ষক ও গবেষকের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে একটি প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তাদের অর্থনৈতিক ও পেশাগতভাবে অপমান করেছে। প্রখ্যাত ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. মাসুদুল আলম চৌধুরী, যিনি কানাডা থেকে এসে দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন, পেয়েছেন না কোনো সম্মানী, না কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। নিজের খরচে দেশে এসে পাঠদান ও পরামর্শমূলক কাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিঃশব্দ প্রস্থান তাকে করেছে হতবাক ও অপমানিত। তিনি জানিয়েছেন, চুক্তিভিত্তিক কাজের পরও কোনো বেতন তো দেওয়া হয়নি, এমনকি পাঠানো লিগ্যাল নোটিসের কোনো উত্তর পর্যন্ত দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এমনই এক লজ্জাজনক ঘটনার শিকার হয়েছেন কিশোর মজুমদার, যিনি ইউএসটিসিতে ১০ বছর শিক্ষকতা করেছেন এবং পরে যবিপ্রবিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। অব্যাহতি চাওয়ার পর তাকে জানানো হয়, পূর্বের দশ বছর বেতনের সব অর্থ ফেরত দিতে হবে। শেষপর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন তিনি। অধ্যাপক মজুমদার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি না হলেও, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সাবেক সদস্য ড. ফৈয়াজ খান অকপটে স্বীকার করেছেন, “ওই সময় অনেক শিক্ষকের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষকরা মুখ খোলেন না, তাই এসব ঘটনা চাপা থাকে।”

ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন আখতার জাহানকেও হঠাৎ অফিস চলাকালেই ছাঁটাই করা হয়, অপমানজনকভাবে একটি অশিক্ষিত কর্মচারীর সই করা চিঠির মাধ্যমে। ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ইউএসটিসিতে কীভাবে ভয়ানক রূপ নিয়েছে।

বুয়েট, চুয়েট ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন খ্যাতিমান শিক্ষক ইউএসটিসিতে খণ্ডকালীন অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন। দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত পাঠদান করার পরেও তারা পাননি কোনো সম্মানী। অনেকে আশা করতেন দেরিতে হলেও বেতন পাবেন, কিন্তু একসময় বুঝতে পারেন, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা।

এই সব ঘটনার পেছনে বারবার উঠে আসে একটি নাম—ইউএসটিসির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বর্তমান চেয়ারম্যান আহমেদ ইফতেখারুল ইসলাম। তিনি প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. নুরুল ইসলামের পুত্র এবং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সব সিদ্ধান্ত তার হাতেই কেন্দ্রীভূত। শিক্ষকদের নিয়োগ, বরখাস্ত, সম্মানির অনুমোদন—সবকিছুতেই তার চূড়ান্ত হস্তক্ষেপ। এমনকি উপাচার্য ও ট্রাস্টি বোর্ডও যেন তার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। বোর্ড সদস্যদের মধ্যে অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইফতেখারুল মূলত বিশ্ববিদ্যালয়টি একক সিদ্ধান্তে চালাচ্ছেন, আর বাকিরা শুধু আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করছেন।

ইউএসটিসির সাবেক ভিসি অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম পর্যন্ত তার প্রাপ্য বেতন না পাওয়ায় হাইকোর্টে রিট করেছেন। একই অবস্থা সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক আবু নওশাদ চৌধুরীর। বোর্ড সদস্য ডা. নিনা ইসলাম নিজেই জানিয়েছেন, ৫০ কোটি টাকার এফডিআর বাবার মৃত্যুর সময় ছিল, তার কোনো হিসাব তারা পাননি। আর শিক্ষকদের বেতন না দেওয়া বা ফেরত চাওয়ার ঘটনায় তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানে সব, তবুও তারা চুপ।”

যেখানে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের আচরণ শুধু শিক্ষকদের অপমান নয়—এটি গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য হুমকি। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানের যন্ত্র নন, তিনি জ্ঞানের বাহক, নৈতিকতার মূর্ত প্রতীক। তাদের প্রতি এমন অবমাননাকর আচরণ দেশের শিক্ষানীতি, পেশাগত নৈতিকতা ও মানবাধিকারের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

এ বিষয়ে ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, আহমেদ ইফতেখারুল ইসলাম ও রেজিস্ট্রার দিলিপ বড়ুয়া যোগাযোগ থেকে বিরত থাকেন এবং প্রতিবেদকের নম্বর ব্লক করে দেন।

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. শাহ আলম সিরাজ এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যেসব শিক্ষক হয়রানির শিকার হয়েছেন, তারা অভিযোগ জানালে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—যখন সম্মান হারায় শিক্ষকেরা, তখন যে ক্ষতি হয়, তা কি কেবল তদন্তে পূরণ হয়?

ইউএসটিসির এই সংকট কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, এটি দেশের শিক্ষা ও প্রশাসনিক নৈতিকতার প্রতিফলন। এখন সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার—শিক্ষকদের সম্মান রক্ষায় আমরা কতটা প্রস্তুত? শিক্ষা কি শুধুই বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে, নাকি আদর্শ ও ন্যায়বিচারের পথে ফিরবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত