প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায় একটি দ্রুতগতির বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই তরুণী শিক্ষার্থীসহ তিন জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার (৬ আগস্ট) দুপুরে, সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের ব্যস্ততম অংশে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সিএনজিটি বাসের আঘাতে দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুইজন। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজন মারা যান।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আফসানা খুশী (১৯), শান্তিগঞ্জ উপজেলার স্নেহা চক্রবর্তী (২০) এবং সুনামগঞ্জ শহরের আলীপাড়ার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম (৭০)। তিনজনই আলাদা উদ্দেশ্যে সিএনজি অটোরিকশায় শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। আফসানা খুশী ও স্নেহা চক্রবর্তী একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শেষে সুনামগঞ্জে ফিরছিলেন। তাদের সঙ্গে একই যানে ছিলেন শফিকুল ইসলাম, যিনি স্থানীয় একটি বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থলে আসা বাসটি অতিমাত্রায় গতি ও অসতর্কতার কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা সিএনজিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় সিএনজিটি কয়েকবার উল্টে যায় এবং ঘটনাস্থলেই আফসানা ও শফিকুল ইসলাম প্রাণ হারান। স্নেহা চক্রবর্তীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় আরও দুজন যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। সুনামগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ মোহাম্মদ হানিফ মিয়া বলেন, “দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাই এবং তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠাই। আমরা দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে দেখছি এবং বাসচালককে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা দেখা দেয়। অনেকেই রাস্তার নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত গতির যান নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা চেয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তারা বলেন, এই সড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে এবং প্রশাসনের নজরদারির অভাবেই এমন প্রাণহানি বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত এবং সংযোগকারী মহাসড়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বিভিন্ন অংশে যান চলাচলের অনুপযুক্ত অবস্থা, গর্ত, অপরিকল্পিত বাঁক এবং দ্রুতগতির যানবাহনের কারণে প্রায়শই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। গত এক বছরে এই রোডেই প্রায় এক ডজন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অধিকাংশের কারণ ছিল বেপরোয়া ড্রাইভিং ও অপ্রশিক্ষিত চালক।
নিহত দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শোকসন্তপ্ত পরিবারদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে একযোগে শোক প্রকাশ করেছে। অনেকে সামাজিক মাধ্যমে নিরাপদ সড়কের দাবি তুলেছেন এবং এই ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, জনসচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতির বাস্তব প্রতিচ্ছবি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, এখনই সময় সড়ক ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, এবং নজরদারির উন্নয়ন ঘটানোর। তা না হলে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামানো সম্ভব হবে না।









