সংকটে তৈরি পোশাকশিল্প, বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
সংকটে তৈরি পোশাকশিল্প, বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাই

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প এখন বহুমুখী সংকটের মুখে। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়া, কার্যাদেশের ঘাটতি, জ্বালানি ও কাঁচামাল সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘ লিড টাইম এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সক্ষমতার ব্যবধান—সব মিলিয়ে চাপে পড়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কারখানার উৎপাদন ও শ্রমবাজারে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কার্যাদেশের অভাবে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা ও পছন্দের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের বৈচিত্র্য ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে বাংলাদেশের পোশাক খাত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। আর এর প্রভাব শুধু রপ্তানি আয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কর্মসংস্থান ও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক আমদানি করলেও বাংলাদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। দেশের পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই দুই বাজারে একসঙ্গে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হওয়ায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।

রপ্তানি কমার প্রভাব ইতোমধ্যে কারখানাগুলোতে দৃশ্যমান। পর্যাপ্ত কার্যাদেশ না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে, কোথাও শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের সুযোগ বন্ধ হয়েছে, আবার কোথাও কারখানা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। বড় কারখানা থেকে কার্যাদেশ কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন দ্রুত থেমে যায়।

চট্টগ্রামে এর মানবিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নগরীর পাহাড়তলী এলাকার একটি টেক্সটাইল কারখানায় অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন শিরিনা বেগম। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই তাঁর পরিবারের নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। চাকরি থাকাকালে অতিরিক্ত কাজসহ মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতেন তিনি। এখন সেই আয় নেই। সংসারে সন্তানদের খরচ, বাজারের বাড়তি দাম এবং অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

শিরিনার মতো আরও বহু শ্রমিকের জীবনেও একই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন পোশাক কারখানা বন্ধ বা উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। কেউ নতুন কাজের সন্ধানে ঘুরছেন, কেউ বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। পোশাক কারখানায় দীর্ঘদিন কাজ করার পর অন্য খাতে গিয়ে কাজ নেওয়া শ্রমিকদের অনেকেই আগের আয়ের সমপরিমাণ অর্থ পাচ্ছেন না। ফলে কর্মসংস্থান থাকলেও পরিবারের আর্থিক চাপ কমছে না।

কারখানা বন্ধের সঙ্গে পাওনা পরিশোধের বিষয়টিও শ্রমিকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারিয়ে অনেকে বেতন, ক্ষতিপূরণ বা অন্যান্য আইনগত পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্রমিকদের যথাযথ নোটিশ না দিয়েই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও অনেকে চাকরি হারানোর পর প্রাপ্য সুবিধা আদায়ে জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামে ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি স্থায়ীভাবে এবং ২৫টি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত সাত হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সময়ে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিকের চাকরিচ্যুতি বা ছাঁটাইয়ের চিত্র পাওয়া গেছে। এদের বড় একটি অংশ তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক।

শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে মালিকরা কাঁচামাল সংকট, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও আর্থিক সমস্যার কথা জানিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আচরণ ও কর্মপরিবেশসংক্রান্ত বিষয়ও মালিকপক্ষের বক্তব্যে এসেছে। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, সংকটের সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাই ও পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করছে। ফলে সমস্যাটি সমাধানে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো পণ্যের বৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতা। বিশ্ববাজারে ম্যান-মেড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে কটনভিত্তিক পোশাকের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলো সুবিধা পাচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক সুবিধাও বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলছে।

ভিয়েতনাম, ভারত ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ দ্রুত সরবরাহ এবং তুলনামূলক কম লিড টাইমের সুবিধা কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানি, বন্দর ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং পরিবহন ব্যবস্থায় সময় বেশি লাগায় ক্রেতাদের কাছে দ্রুত অর্ডার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে এখন শুধু কম উৎপাদন খরচ যথেষ্ট নয়; দ্রুত সরবরাহ, মান, নকশা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে দেশের জ্বালানি সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। উৎপাদন কমে গেলে শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের সুযোগও কমে যায়। ফলে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনেক শ্রমিকের মাসিক আয় কমে যায়। শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা দূর করা না গেলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বর্তমান সংকট থেকে বের হতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী নতুন পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার পোশাক, উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে বন্দর ও কাস্টমসের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, তৈরি পোশাকশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে এর প্রভাব বহুমাত্রিক হতে পারে। পোশাক খাতে উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি আয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ তৈরি হবে এবং বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। শ্রমিকদের আয় কমে গেলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগব্যয়ও কমতে পারে। ফলে একটি শিল্পের সংকট ধীরে ধীরে অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে শিল্পকারখানা সচল রাখা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং রপ্তানি বাজার পুনরুদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, কার্যাদেশ ধরে রাখার জন্য নীতিগত সহায়তা এবং শ্রমিকদের আইনগত পাওনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নতুন বাজার খোঁজা এবং প্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে।

তৈরি পোশাকশিল্প শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় উৎস নয়, লাখ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি খাত। তাই একটি কারখানার দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে শুধু যন্ত্রপাতি থেমে যায় না, থেমে যায় বহু পরিবারের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের খাবার, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিরাপত্তা তখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সেই মানবিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত