প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকলেও তুলনামূলক নির্জন একটি এলাকায় মাত্র ১৩০ মিটার সড়ক নির্মাণে প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভার মুক্তারপুর এলাকায় পদ্মা নদীর তীর পর্যন্ত নির্মিত এই সড়ক নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও প্রশ্ন। তাদের অভিযোগ, যেখানে প্রতিদিন মানুষের চলাচল বেশি এবং দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করে কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তারপুর-ইউসুফপুর প্রধান সড়ক থেকে পদ্মা নদীর তীর পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ১৩০ মিটার এবং প্রস্থ সাড়ে চার মিটার। আরসিসি ও পাথরের ঢালাইয়ের মাধ্যমে নির্মিত সড়কটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার টাকা। ইন্টিগ্রেটেড আরবান গভর্নেন্স অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কাজটি করেছে জুয়েল ইলেকট্রনিক্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ চলতি বছরের আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে শেষ হয়।
সড়কটি নির্মাণের পর স্থানীয়দের একটি অংশ উন্নয়নকাজকে স্বাগত জানালেও এর স্থান নির্বাচন ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, সড়কটির আশপাশে বর্তমানে তেমন জনবসতি নেই। নিয়মিত যানবাহন চলাচলের চিত্রও চোখে পড়ে না। মূলত পদ্মা নদীর তীরের দিকে যাতায়াতের জন্য সড়কটি তৈরি করা হয়েছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সড়কটি বর্তমান সময়ে কতটা জনস্বার্থে কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুখলেসুর রহমান ও মোজাফফর হোসেনের অভিযোগ, পৌরসভার এমন অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে মানুষ প্রতিদিন চলাচল করেন, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা যাতায়াত করেন, কৃষিপণ্য পরিবহন হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সড়কের ওপর মানুষের নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অনেকগুলো এখনো কাঁচা, ভাঙাচোরা কিংবা খানাখন্দে ভরা। বর্ষাকালে এসব সড়কে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ লোকালয়হীন একটি এলাকায় তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করে সড়ক নির্মাণ করায় তারা হতাশ হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগের মূল জায়গাটি শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, বরং উন্নয়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকার নিয়েও। একটি পৌর এলাকায় সীমিত উন্নয়ন বরাদ্দ থাকলে কোন সড়ক আগে সংস্কার করা হবে, কোন এলাকায় নতুন সড়ক প্রয়োজন এবং কোন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় করা হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো যখন সংস্কারের অপেক্ষায় থাকে, তখন কম ব্যবহৃত এলাকায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান এই ঘটনাকে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও সম্পদ অপচয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে কোনো এলাকার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন, জনসংখ্যা, যোগাযোগের গুরুত্ব এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শুধু বরাদ্দ রয়েছে বলেই কোনো এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে জনগণের প্রকৃত চাহিদা পূরণ নাও হতে পারে।
তবে পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। চারঘাট পৌরসভার প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, মুক্তারপুর থেকে সারদা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছাড়পত্র না পাওয়ায় পুরো সড়কটি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। অনুমোদিত ১৩০ মিটার অংশই আপাতত নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক প্রকল্প নয়; বরং বৃহত্তর একটি সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিকল্পনাটি নেওয়া হয়েছিল।
পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মজিবুর রহমানও সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তার ভাষ্য, ভবিষ্যতে ওই এলাকায় বসতি গড়ে উঠতে পারে। নির্মাণকাজে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হয়নি। কাজের ক্ষেত্রে ছোটখাটো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করে নেওয়া হয়েছে। ফলে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে সড়কটি কেবল বর্তমান ব্যবহার বিবেচনায় নয়, ভবিষ্যৎ জনবসতি ও যোগাযোগের প্রয়োজন মাথায় রেখেও নির্মাণ করা হয়েছে।
কিন্তু স্থানীয় বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। চারঘাট পৌর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতিদিন মানুষ ও যানবাহনের চলাচল থাকলেও সেগুলোর অনেক অংশ সংস্কারের অভাবে বেহাল হয়ে আছে। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, আবার কোথাও খানাখন্দের কারণে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব সড়ক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তাদের প্রশ্ন, সীমিত সরকারি অর্থ থাকলে আগে কি এসব জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার করা উচিত ছিল না?
চারঘাটের মুক্তারপুর এলাকা অবশ্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ এলাকায় রাজশাহী ক্যাডেট কলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং পদ্মা নদীর তীরবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটির নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন হতে পারে—পৌর কর্তৃপক্ষের এমন যুক্তিরও বাস্তব ভিত্তি থাকতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পাশাপাশি বর্তমান ব্যবহার ও জনস্বার্থের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি জনগণের প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির অংশ। বিশেষ করে বৈদেশিক সহায়তায় বাস্তবায়িত প্রকল্পের অর্থও শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন ও জনকল্যাণের উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়। তাই কোনো প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, কাজের মান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া জরুরি।
১৩০ মিটার সড়কের এই ঘটনা সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে। একটি সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু সেই সড়ক কত মানুষ ব্যবহার করবেন, স্থানীয় অর্থনীতি ও যোগাযোগে এর অবদান কতটা হবে, ভবিষ্যতে এর ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা কী এবং একই অর্থ অন্য কোনো জরুরি সড়কে ব্যয় করলে জনগণ আরও বেশি উপকৃত হতেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ক্ষোভের আরেকটি কারণ নির্মাণের মান নিয়েও। তাদের কেউ কেউ বলছেন, বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সড়কটি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মানসম্মত হয়নি। যদিও পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, কাজের ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা হয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের নকশা, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, বাস্তবায়ন ব্যয় এবং নির্মাণের গুণগত মান যথাযথভাবে যাচাই করা হলে বিতর্কের অনেকটাই অবসান হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। কোন অবকাঠামো মানুষের জীবন সহজ করবে এবং কোন প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করবে, সেই হিসাবও জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নগরায়ণ ও জনবসতির সম্ভাবনাও পরিকল্পনায় রাখা প্রয়োজন। তবে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে বর্তমানের জরুরি প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা হলে উন্নয়ন ব্যয় জনগণের প্রত্যাশিত সুফল নাও দিতে পারে।
চারঘাটের এই ১৩০ মিটার সড়ক তাই শুধু একটি রাস্তা নির্মাণের ঘটনা নয়; এটি স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকার, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং জনস্বার্থে প্রকল্প নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, তাদের এলাকায় যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে পৌর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, নির্মিত সড়কটি ভবিষ্যতে এলাকার যোগাযোগ ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
শেষ পর্যন্ত একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হয় তার ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং জনগণ কতটা উপকৃত হলো তার মাধ্যমে। চারঘাটের মুক্তারপুরের সড়কটিও সেই পরীক্ষার মুখোমুখি। এখন প্রয়োজন প্রকল্পটির ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে পৌর এলাকার বেশি জনসংখ্যা ও জনচলাচলপূর্ণ বেহাল সড়কগুলোর সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তবেই উন্নয়ন ব্যয়ের সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনের দুর্ভোগ কমানোর একটি কার্যকর যোগসূত্র তৈরি হবে।