এলএনজি কার্গো এলে কমবে গ্যাস সংকট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
এলএনজি কার্গো এলে কমবে গ্যাস সংকট

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট কিছুটা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামীকাল রোববার এলএনজির একটি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। কার্গোটি মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যুক্ত হওয়ার পর সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হলে সামগ্রিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্পকারখানাগুলোতে সরবরাহ বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কার্গো এলেই সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে না। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে হলে পরবর্তী এলএনজি কার্গোগুলোও নির্ধারিত সময়ে দেশে আনতে হবে। একই সঙ্গে এক্সিলারেট ও সামিট—দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকেই নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাময়িকভাবে চাপ কমলেও আবারও সংকট তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৪টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে এসেছে মাত্র ৫৮ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে এলএনজির পুরো সরবরাহই সামিটের টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় গ্যাস ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

গত মাসের শেষদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। টার্মিনালটি অচল হয়ে পড়ায় আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এরপর সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করা হলেও দেশের সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং শিল্প খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্যাসের সংকট দেখা দেয়।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ ঘোরাফেরা করছে ২২০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতির কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে এবং অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন আংশিকভাবে চলছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে কারখানা।

নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে সংকটের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গ্যাসের চাপ অনেক এলাকায় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় ছোট-বড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাবে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। জেলার টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলগুলোর বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় উদ্যোক্তাদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গাজীপুরেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ এক পিএসআইয়ের নিচে নেমে যাওয়ায় গ্যাসনির্ভর বহু শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে, সেখানেও উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়ছে।

চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বায়েজিদ, অক্সিজেন ও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় ছোট ও মাঝারি পোশাক, বস্ত্র, সুতা ও অ্যাক্সেসরিজ কারখানার একটি অংশ ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাসনির্ভর নিটিং, ডাইং, প্রিন্টিং ও কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, গ্যাসের সংকট শুধু উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে পুরো ব্যবসায়িক চক্রে। কারখানা চালু রাখতে না পারায় কাঁচামাল পড়ে থাকছে, কোথাও উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপকরণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আবার উৎপাদন সময়মতো শেষ করতে না পারায় ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এমন আশঙ্কাও করছেন উদ্যোক্তারা।

বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য গ্যাস সংকট বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনাম, ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতা রয়েছে। ক্রেতারা সময়মতো পণ্য সরবরাহ, উৎপাদন খরচ এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশের কারখানাগুলো যদি জ্বালানি সংকটের কারণে নিয়মিত উৎপাদন চালাতে না পারে, তাহলে ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এ অবস্থায় রোববারের এলএনজি কার্গোকে ঘিরে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, কার্গোটি নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছে খালাস করা সম্ভব হলে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু করা যাবে। শুরুতে সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়িয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুটে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। জাতীয় গ্রিডে এই পরিমাণ গ্যাস যুক্ত হলে সামগ্রিক ঘাটতির চাপ কিছুটা কমতে পারে।

শিল্প উদ্যোক্তারা অবশ্য নতুন করে যুক্ত হওয়া গ্যাসের একটি অংশ শিল্প খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে শিল্প খাতে গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, শিল্প খাতকে দীর্ঘ সময় গ্যাস সংকটে রেখে উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব নয়। কারণ শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ এবং সরকারের রাজস্ব জড়িত।

একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, এলএনজি সরবরাহের একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। একটি কার্গো আসার পর কিছুদিন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পরবর্তী কার্গো সময়মতো না এলে আবারও আগের সংকট ফিরে আসতে পারে। তাই আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, টার্মিনালের সক্ষমতা এবং জাতীয় গ্যাস গ্রিডের চাহিদা সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

গ্যাস সংকটের প্রভাব শিল্পের বাইরেও বিস্তৃত। জ্বালানি সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। সার উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। আবার শিল্পকারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের আয় কমে যায় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দেয়। ফলে গ্যাস সংকটকে শুধু একটি জ্বালানি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও দীর্ঘমেয়াদে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর আমদানি ব্যয় অনেকটাই নির্ভরশীল। তাই আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে রোববারের এলএনজি কার্গোকে ঘিরে স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি হলেও দেশের গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরের বিষয়। এক্সিলারেটের টার্মিনাল সচল হয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে শিল্পাঞ্চলে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে সংকট পুরোপুরি কাটাতে হলে ধারাবাহিক এলএনজি সরবরাহ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং শিল্প খাতে যৌক্তিক ও স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। কারণ গ্যাসের চাপ কমে গেলে শুধু কারখানার চুল্লি বা মেশিন থেমে থাকে না, তার সঙ্গে থেমে যায় শ্রমিকের আয়, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ এবং অর্থনীতির গতিও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত