প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘের আট দশকের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত নয়জন মহাসচিব দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই পুরুষ। এবার সেই দীর্ঘ ইতিহাস বদলে কি প্রথমবারের মতো একজন নারী মহাসচিব পেতে যাচ্ছে জাতিসংঘ?
আগামী ৩১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাঁর উত্তরসূরি বাছাইয়ের দৌড়ে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে থাকা আট প্রার্থীর পাঁচজনই নারী। নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক ভোটেও শীর্ষ তিন প্রার্থীর দুজন নারী। গত ৩০ জুলাই ও ২১ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে দুই দফা অনানুষ্ঠানিক গোপন ভোট বা ‘স্ট্র পোল’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে কে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হবেন, তার উত্তর এখনও অনিশ্চিত। কারণ মহাসচিব নির্বাচন যতটা প্রকাশ্য, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া ততটাই আড়ালের। জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ মহাসচিব নিয়োগ করে। এর বাইরে সনদে বিস্তারিত কোনো পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি।
এই অস্পষ্টতার সুযোগে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—মহাসচিব নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। পাঁচ দেশের যেকোনো একটি দেশ ভেটো দিলে কোনো প্রার্থীর পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ করার চেষ্টা অবশ্য হয়েছে। ২০১৫ সালের সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এবার সাধারণ পরিষদের ৭৯/৩২৭ নম্বর প্রস্তাবের আলোকে প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রচারণার অর্থায়নসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গত ২৩ জুলাই সাধারণ পরিষদ কক্ষে আয়োজিত টাউন হলে প্রার্থীরা সদস্য রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সামনে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। জাতিসংঘের আর্থিক সংকট, নেতৃত্বে লিঙ্গসমতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট নিয়েও আলোচনা হয়।
তবে এসব পদক্ষেপ নির্বাচনের বাহ্যিক অংশকে স্বচ্ছ করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মূল জায়গাটি এখনও নিরাপত্তা পরিষদের হাতেই রয়েছে।
গোপন ভোটেই বদলে যাচ্ছে সমীকরণ
মহাসচিব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক গোপন ভোট। এতে ১৫ সদস্য প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য আলাদা ব্যালটে তাঁকে ‘উৎসাহিত’, ‘নিরুৎসাহিত’ অথবা ‘কোনো মতামত নেই’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
প্রথম দফার ভোটে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার মহাসচিব কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান ১০টি উৎসাহিত ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তাঁর বিপক্ষে ছিল মাত্র একটি নিরুৎসাহিত ভোট।
তিন সপ্তাহ পর দ্বিতীয় দফার ভোটে চিত্র বদলে যায়। ২১ আগস্টের ভোটে গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি কারোলিন রদ্রিগেজ-বার্কেট আটটি উৎসাহিত ভোট পেয়ে শীর্ষে উঠে আসেন। গ্রিনস্প্যানের উৎসাহিত ভোট কমে দাঁড়ায় সাতটিতে। তাঁর বিপক্ষে নিরুৎসাহিত ভোটও বেড়ে চারটি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি সাতটি উৎসাহিত ভোট পেয়েছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে নিরুৎসাহিত ভোট পড়েছে ছয়টি—সব প্রার্থীর মধ্যে যা সর্বোচ্চ।
এরপর সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল ছয়টি, উগান্ডার ওলারা ওতুনু পাঁচটি, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা চারটি এবং চিলির মিশেল ব্যাচেলেট দুটি উৎসাহিত ভোট পেয়েছেন। ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকি কোনো উৎসাহিত ভোট পাননি।
৯ ভোটের পাশাপাশি দরকার ভেটোমুক্তি
নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ পেতে একজন প্রার্থীর অন্তত নয়টি সমর্থন প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কারও ভেটো থাকা চলবে না।
দুই দফা ভোটের পর এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থীই নয়টি উৎসাহিত ভোট পাননি। তবে এই প্রতিযোগিতায় শুধু সমর্থনের সংখ্যা নয়, নিরুৎসাহিত ভোটও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো স্থায়ী সদস্যের নেতিবাচক অবস্থান শেষ পর্যন্ত ভেটোতে রূপ নিতে পারে।
পরবর্তী ধাপে পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে আলাদা রঙের ব্যালট দেওয়া হবে। তখন কোন প্রার্থীর প্রতি পরাশক্তিগুলোর আপত্তি রয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদ আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
নারী প্রার্থীদের সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে কোনো আইনগতভাবে নির্ধারিত আঞ্চলিক বা লিঙ্গভিত্তিক কোটা নেই। তবে কয়েকটি অলিখিত রীতি এই প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে।
এ পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপ থেকে চারজন, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে দুজন করে এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে একজন মহাসচিব হয়েছেন। এই আঞ্চলিক ভারসাম্যের যুক্তিতে আফ্রিকার প্রার্থী ম্যাকি সালও শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন।
আরেকটি অলিখিত রীতি হলো পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের কোনো নাগরিক এখন পর্যন্ত মহাসচিব হননি। তবে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা হলো লিঙ্গের ক্ষেত্রে বৈষম্য। জাতিসংঘ বিশ্বজুড়ে নারীর রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বললেও নিজের সর্বোচ্চ পদে কখনও একজন নারীকে বসাতে পারেনি।
২০১৬ সালের নির্বাচনেও একাধিক নারী প্রার্থী ছিলেন। এবার আনুষ্ঠানিক প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠই নারী হওয়ায় ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
এই দাবিকে শক্তিশালী করছে নাগরিক সমাজের প্রচারাভিযান ‘১ ফর ৮ বিলিয়ন’। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে প্রথম নারী মহাসচিব নিয়োগের পাশাপাশি আরও উন্মুক্ত, ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
পরাশক্তির সমর্থনই শেষ কথা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোকে পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে দেখতে চান বলে মন্তব্য করেছেন। তবে কোনো সদস্য রাষ্ট্র তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন দেয়নি। ফলে তাঁর নাম বর্তমান প্রার্থী তালিকায় নেই।
অন্যদিকে জাতিসংঘের ইতিহাসে এমন নজিরও রয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রার্থী পরাশক্তির ভেটোর কারণে এগোতে পারেননি। বুট্রোস বুট্রোস-ঘালি দ্বিতীয় মেয়াদে যেতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে।
এ কারণে বর্তমান প্রতিযোগিতায় কোনো প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা প্রকাশ্য জনসমর্থনের পাশাপাশি পাঁচ স্থায়ী সদস্যের গ্রহণযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন
পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, তা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম প্রধান সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশ। ফলে শান্তিরক্ষা মিশনের নীতি, কাঠামো ও অর্থায়নের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঢাকার স্বার্থ সরাসরি জড়িত।
এ ছাড়া ফিলিস্তিন সংকট, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং বাণিজ্য বৈষম্যের মতো ইস্যুতে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ঢাকার প্রত্যাশা শুধু প্রথম নারী মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এমন একজন নেতৃত্বের প্রয়োজন, যিনি পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা রাখার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবেন।
দুই দফা স্ট্র পোলের পরও মহাসচিব নির্বাচনের লড়াই অমীমাংসিত। টাউন হলের বক্তব্য, প্রার্থীদের রূপকল্প কিংবা কোনো পরাশক্তির নেতার প্রকাশ্য প্রশংসা—কোনোটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করছে না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের নীরব সমঝোতার ওপর।
এবার তাই জাতিসংঘের সামনে দুটি বড় প্রশ্ন—৮১ বছরের পুরোনো পুরুষপ্রধান নেতৃত্বের ধারা ভেঙে প্রথমবার কোনো নারী মহাসচিব হতে পারবেন কি না এবং যিনিই দায়িত্ব নিন, তিনি পরাশক্তির আস্থা ও উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রত্যাশার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে পারবেন কি না।