অস্ত্র রপ্তানিতে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার :সেনাপ্রধান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৯ বার
অস্ত্র রপ্তানিতে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার :সেনাপ্রধান

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেছেন, দেশেই সমরাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে নিজেদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত উৎপাদিত অস্ত্র বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের সম্প্রসারিত অংশে দেশের দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা অস্ত্র উৎপাদন কারখানা স্থাপনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর ও হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। একসময় যেখানে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের জন্য শিল্পযন্ত্রের শব্দ শোনা যেত, সেই বিশাল শিল্পপ্রাঙ্গণ এবার বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতার নতুন অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেন, অস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্য কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা নয়। ভবিষ্যতে এই খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সমরাস্ত্রের অতিরিক্ত অংশ বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হলে এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্ব নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি নতুন কোনো শিল্প যদি আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়বে। প্রতিরক্ষা শিল্প সেই সম্ভাব্য নতুন খাতগুলোর একটি হতে পারে। তবে এ ধরনের শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি অর্জন এবং কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

ফৌজদারহাটে যে স্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা বা বিওএফের সম্প্রসারণের অংশ। বিওএফ বর্তমানে দেশের প্রধান দেশীয় সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, বিদেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৪ দশমিক ৯৯ একর জমি ও স্থাপনা এই সম্প্রসারণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির জমি ও স্থাপনা প্রতীকী মূল্যে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ১ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

জায়গাটি নির্বাচনের পেছনে কৌশলগত কারণও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেনাপ্রধান। তাঁর মতে, পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় এলাকাটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে এর প্রভাব যাতে আশপাশের জনবসতিতে কম পড়ে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান করায় সামরিক ও লজিস্টিক দিক থেকেও এলাকাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ও পরিবহন সুবিধা কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে রপ্তানির বিষয়টি বাস্তবে কার্যকর করতে হলে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ক্রেতা দেশের আইন এবং প্রতিরক্ষা পণ্যের কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।

দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক নির্ভরতা কমানো। সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্র কেনার অর্থই ব্যয় হয় না; এর সঙ্গে পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ও যুক্ত থাকে। দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে কিছু ক্ষেত্রে আমদানির চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে স্বল্প সময়ে সব ধরনের আধুনিক অস্ত্র দেশেই তৈরি করা সম্ভব হবে। আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর। উন্নত মানের গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, সেন্সর কিংবা অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উন্নত গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থা, দক্ষ প্রকৌশলী, আধুনিক পরীক্ষাগার, মাননিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের জন্য এই নতুন উদ্যোগ তাই শুধু একটি কারখানা নির্মাণের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে যদি গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রতিরক্ষা সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিরক্ষা শিল্প শুধু সামরিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করে না; এটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, প্রকৌশল দক্ষতা, ধাতব শিল্প, ইলেকট্রনিকস, সফটওয়্যার, কম্পোজিট উপাদান এবং উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশ যদি ধীরে ধীরে এই খাতে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে এর প্রভাব প্রতিরক্ষা খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অবশ্য এই রূপান্তরের সঙ্গে একটি মানবিক ও প্রশাসনিক প্রশ্নও জড়িত। জলিল টেক্সটাইল মিল দীর্ঘদিন আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সাবেক শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি অংশ তাঁদের পাওনা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সহস্রাধিক সাবেক শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা বেতন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ পাওনা অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন। ফলে মিলের জমি নতুন কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মীদের ন্যায্য পাওনা নিষ্পত্তির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একটি পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জায়গায় নতুন শিল্প স্থাপনের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হবে তখনই, যখন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি পুরোনো দায়ও দায়িত্বশীলভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। প্রতিরক্ষা শিল্পের আধুনিকায়নের সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি সাংঘর্ষিক নয়; বরং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ক্ষেত্রে দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বাংলাদেশ ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে শুধু স্বনির্ভরতার কথা ভাবছে না, বরং সম্ভাব্য রপ্তানি বাজার নিয়েও চিন্তা করছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমে দেশীয় চাহিদার জন্য নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এরপর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় আসবে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য বাজার খুঁজে পাওয়াও সহজ হবে না। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েলসহ বহু দেশের শক্তিশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু কম দাম যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, নির্ভরযোগ্যতা, বিক্রয়োত্তর সেবা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

তারপরও বাংলাদেশের সামনে একটি বাস্তব সুযোগ রয়েছে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান, শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা, ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত জনবল এবং সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের বিদেশি সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে একটি প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। শুরুতে তুলনামূলক সহজ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে প্রযুক্তির জটিলতা বাড়ানো যেতে পারে।

সাভারে একই দিনে সেনাপ্রধান কোর অব মিলিটারি পুলিশ এবং রিমাউন্ট ভেটেরিনারি অ্যান্ড ফার্ম কোরের বার্ষিক অধিনায়ক সম্মেলনেও অংশ নেন। এসব আয়োজনে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখার পেশাগত সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমের বিষয় গুরুত্ব পায়। এর পাশাপাশি ফৌজদারহাটের নতুন প্রতিরক্ষা উৎপাদন স্থাপনা সেনাবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি ঐতিহাসিকভাবে আত্মরক্ষা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সেই কাঠামোর মধ্যে দেশীয়ভাবে সমরাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের অর্থ হলো সংকটের সময়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নেওয়া গেলে তা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।

সেনাপ্রধানের ‘রপ্তানিমুখী প্রতিরক্ষা শিল্প’ গড়ে তোলার বক্তব্য তাই কেবল সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও যুক্ত। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, দক্ষতা, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ওপর জোর দিতে হবে।

ফৌজদারহাটে নতুন কারখানার যাত্রা শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সেখানে কী ধরনের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয় এবং সেই সক্ষমতা কতটা টেকসইভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে একসময় যে প্রাঙ্গণে বস্ত্র উৎপাদনের ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গাই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের নতুন ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

আর সেই ভবিষ্যৎ যদি দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের তৈরি প্রতিরক্ষা পণ্যের পরিচিতি তৈরি করতে পারে, তাহলে এটি শুধু সামরিক স্বনির্ভরতার অর্জন হবে না; দেশের রপ্তানি অর্থনীতিতেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত