সৌদির আগুনে নিহত ৭ জনের মরদেহ নওগাঁয় পৌঁছেছে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার
সৌদির আগুনে নিহত ৭ জনের মরদেহ নওগাঁয় পৌঁছেছে

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাত প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ অবশেষে নিজ মাটিতে ফিরেছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর স্বজনদের উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহগুলো আত্রাইয়ে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। রাতেই স্বজন ও স্থানীয় মানুষ মরদেহগুলো একনজর দেখার জন্য আত্রাই থানা কম্পাউন্ডে ভিড় করেন।

গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর বাসিন্দা ছিলেন। আগুনে মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় প্রথমদিকে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে নিহতদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। প্রথম দফায় নয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সাতজন নওগাঁর আত্রাইয়ের বাসিন্দার মরদেহ ২৭ আগস্ট বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪০ ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। বিমানবন্দরে সরকারি কর্মকর্তারা মরদেহ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো তাঁদের নিজ এলাকায় নেওয়া হয়।

আত্রাইয়ে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। প্রবাসে কর্মরত একজন মানুষের মরদেহ সাধারণত একটি পরিবারের কাছে শুধু একজন প্রিয়জনকে হারানোর সংবাদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের স্বপ্ন, ঋণ পরিশোধের আশা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রত্যাশা। সৌদি আরবের ওই কারখানার আগুনে সেই স্বপ্নগুলো মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেছে।

নিহত সাতজন হলেন আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী, বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার। তাঁদের মধ্যে গণ্ডগোহালী গ্রামের মোহন আলী ও সুমন আলী ছিলেন দুই ভাই।

দুই ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় গণ্ডগোহালী গ্রামের শোকের মাত্রা আরও গভীর হয়ে উঠেছে। এর আগেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও দেশীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, মোহন দীর্ঘদিন আগে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং পরে তাঁর ছোট ভাই সুমনও একই দেশে যান। একই কর্মস্থলে কাজ করা দুই ভাইয়ের জীবন থেমে যায় একই অগ্নিকাণ্ডে। তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্ন ছিল, তা মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়।

নওগাঁর সঙ্গে এই দুর্ঘটনার সম্পর্ক শুরু থেকেই ছিল গভীর। ৯ আগস্টের আগুনের পর প্রথমদিকে স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে পরিচয় শনাক্তকরণ ও সরকারি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিহতদের সংখ্যা ও পরিচয় সম্পর্কে তথ্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের ওই অগ্নিকাণ্ডে মোট ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম দফায় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদ এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়। মরদেহগুলো অতিরিক্তভাবে পুড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক উপায়ে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এ কারণে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করতে সময় লেগেছে।

আত্রাই উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সৌদি আরবে পাঠানোর পাশাপাশি বিমানবন্দর থেকে মরদেহগুলো নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রশাসনের সমন্বয়ে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে পরিবারগুলোর ওপর মরদেহ পরিবহনের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়ে।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং নিহতদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সাতজনের জানাজা একসঙ্গে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টায় আত্রাই মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে মরদেহগুলো নিজ নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি জীবিকার সন্ধানে দেশটিতে যান। তাঁদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনের সঙ্গে যে ঝুঁকি জড়িয়ে থাকে, রিয়াদের এই অগ্নিকাণ্ড সেই বাস্তবতাকেও নির্মমভাবে সামনে এনেছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ নির্মাণ, কারখানা, পরিবহন, পরিষেবা ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে নিয়োজিত। কর্মস্থলের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং কর্মীদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ যথাযথ না হলে একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বহু পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে। রিয়াদের এই ঘটনায় একসঙ্গে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি প্রবাসী কর্মীদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি অধ্যায় শেষ হয়েছে, কিন্তু তাঁদের শোকের অধ্যায় এখনই শেষ হওয়ার নয়। যাঁরা প্রবাসে গিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁদের অনুপস্থিতিতে সেই পরিবারগুলোকে এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

এ অবস্থায় নিহতদের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার কথা আগেই জানানো হয়েছিল। এখন সেই সহায়তা দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় পরিবারের হাতে পৌঁছানোই হবে সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

একজন প্রবাসী শ্রমিকের আয় শুধু তাঁর নিজের পরিবারের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগের আগে কর্মস্থলের নিরাপত্তা সম্পর্কে তথ্য প্রদান, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব নিশ্চিত করা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

রিয়াদের আগুনে ১৬টি বাংলাদেশি পরিবারের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো অর্থমূল্যে পূরণ হওয়ার নয়। তবু রাষ্ট্রীয় সহায়তা, মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরানো এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে অন্তত তাঁদের দুর্দশা কিছুটা লাঘব করা সম্ভব। আত্রাইয়ে সাতজনের মরদেহ পৌঁছানোর পর এখন তাঁদের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে। একসঙ্গে সাতটি জানাজা শুধু একটি এলাকার জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই এক গভীর শোকের মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবের মাটিতে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া এই মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত ফিরলেন নিথর দেহে। তাঁদের সঙ্গে ফিরেছে কয়েকটি পরিবারের অপূর্ণ স্বপ্ন, স্বজনদের অসীম অপেক্ষার অবসান এবং প্রবাসী জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন এক কঠিন বাস্তবতার স্মরণ। এখন তাঁদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করাই হবে সবচেয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত