শাহবাগই তাঁকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে: তাহের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
শাহবাগই তাঁকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে: তাহের

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য ও বিরোধী দলের প্রতি তাঁর আচরণের সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এবং বিরোধীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এগুলো পল্টন না, এটা শাহবাগ না’—এ ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। তাহেরের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত, যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন, তার সঙ্গে শাহবাগের আন্দোলনের সম্পর্ক রয়েছে।

তাহের বলেন, ‘আজকে যে উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এটা শাহবাগের প্রোডাক্ট। শাহবাগই ওনাকে আজকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে।’ তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে সংসদের বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে বক্তব্যটি সম্পূর্ণভাবে তাহেরের রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পৃথক কোনো বক্তব্যের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়েও কথা বলেন তাহের। তাঁর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়মিত বিভিন্ন মন্তব্যের মাধ্যমে বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করেন। তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উত্তপ্ত ভাষার বদলে সংসদীয় সংস্কৃতি বজায় রেখে সমালোচনা করাই তাঁদের লক্ষ্য বলে দাবি করেন তিনি।

তাহের বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা আমিরসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকেন, যাতে সংসদের পরিবেশ কোনোভাবে হীন বা কলুষিত না হয়। তাঁর ভাষায়, তাঁরা একটি ‘কালচারড’ ও ‘সিভিলাইজড’ সংসদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। সে কারণে সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করলেও সংসদীয় শালীনতার সীমা অতিক্রম করতে চান না।

এদিকে বর্তমান সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্ক নিয়েও বিস্তর অভিযোগ তুলেছেন তাহের। তাঁর দাবি, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তাঁদের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের জন্য সমান সুযোগ পাওয়ার কথা।

তাহেরের অভিযোগ, উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দে বিএনপি নিজেদের লোকদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকাকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, যে আন্দোলনের অন্যতম মূল বক্তব্য ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, সেই বৈষম্যের ক্ষেত্রেই বর্তমান সরকার ‘চ্যাম্পিয়ন’ হয়ে উঠছে।

তবে উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের এই অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বা তথ্য এখানে তুলে ধরা হয়নি। ফলে তাহেরের বক্তব্যকে রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও জনজীবনের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। তাঁর দাবি, দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, তেল, সার ও বীজের সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব সমস্যার প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তাহের।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে জরুরি সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ জানানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেই অনুরোধের ভিত্তিতে অধিবেশন ডাকা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাহের জানান, পরে ২৭ আগস্ট সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। বিরোধী দল আশা করেছিল, তাদের দেওয়া চিঠি ও সেখানে উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে। কিন্তু সেগুলো অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে বিরোধী দলের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তাহের।

বিরোধী দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ করেছেন জামায়াতের এই নেতা। তাঁর দাবি, বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ ধরনের বৈষম্য সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রত্যেক সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালনের জন্য সমান সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

গণভোটের রায় নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্যের প্রসঙ্গ তোলেন তাহের। তাঁর দাবি, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই ধরনের আদেশের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি যদি গণভোটকে সংবিধানের আওতাভুক্ত নয় বলে মনে করে, তাহলে একই যুক্তিতে নির্বাচন ও নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাহের বলেন, বিরোধী দল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধারাবাহিকতায় বিরোধী দলের লংমার্চের উদ্দেশ্য জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরা এবং বিএনপি গণভোটের প্রশ্নে জাতির সঙ্গে ‘বেইমানি’ ও ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করছে—এমন অভিযোগ জনসমক্ষে তুলে ধরা বলে দাবি করেন তিনি।

সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানেরও কঠোর সমালোচনা করেন তাহের। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও বাস্তবে দুর্নীতি কমার বদলে আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তাহের বলেন, ‘জিরোটা আছে; কিন্তু তার বাঁয়ে আরও ১০০ যোগ হয়ে গেছে।’

চাঁদাবাজির প্রসঙ্গেও সরকারকে প্রশ্ন করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে বাস্তবে এসব কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকলে সরকারের ঘোষিত নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবহার নিয়েও আপত্তি জানান তাহের। তাঁর অভিযোগ, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন বিল পাস করছে এবং বিরোধী দলের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্তের অংশীদার হতে চান না বলেও জানান তিনি।

তাহের বলেন, বিরোধী দল অতীতেও জনগণের স্বার্থে সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদ করেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ভূমিকা পালন করছে। তাঁর দাবি, কিছু বিলের আলোচনায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও সেই রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ।

এদিকে একই রাতে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও সংসদের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করার সময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কটূক্তিপূর্ণ আচরণ করেছেন। স্পিকারও এ ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলামের দাবি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলসহ তিনটি বিল সংসদে উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা এসব বিল বিচ্ছিন্নভাবে না এনে একসঙ্গে আনার কথা বললেও সরকার সেগুলো পৃথকভাবে নিয়ে নিজেদের মতো করে পাস করিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংসদ পরিচালনায় সরকারের ‘সংসদীয় স্বেচ্ছাচারিতা’ এবং ‘স্বৈরতন্ত্রের’ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, স্পিকার ও সরকারি দল এককভাবে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বিরোধী দলের বক্তব্যকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের সংসদ অধিবেশন ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন বরাদ্দ, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য ও গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলের অভিযোগ সামনে এসেছে, অন্যদিকে সংসদীয় আচরণ ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংসদ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। সেখানে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে সেই মতপার্থক্য যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি বা পারস্পরিক অবিশ্বাসে রূপ না নেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো—তাঁরা রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও জনস্বার্থের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং সংসদকে কার্যকর বিতর্ক ও জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করবেন।

আবদুল্লাহ তাহের ও নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, সেগুলোর সত্যতা ও বাস্তবতা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে এসব অভিযোগের পাশাপাশি সরকারের বক্তব্যও সমানভাবে সামনে আসা জরুরি। কারণ সংসদে কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু বিরোধী দলের প্রশ্ন নয়, সরকারের পক্ষ থেকেও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদের ভেতরের উত্তাপ যেন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলোকে আড়াল না করে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের বাইরে জনগণের নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, জ্বালানি সরবরাহ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত