ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে ৫৯ নারীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ বার
ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে ৫৯ নারীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দরিদ্র নারীদের কাছ থেকে টাকা ও ব্যক্তিগত কাগজপত্র নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবদল ও বিএনপির দুই নেতার বিরুদ্ধে। উপজেলার মহিচাইল ইউনিয়নের জামিরাপাড়া, জোরপুকুরিয়া ও ছেঙ্গাছিয়া গ্রামের অন্তত ৫৯ নারীর কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি এবং জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় ১৫ জন নারীর স্বাক্ষরসংবলিত একটি লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে—এমন আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়। কার্ড পাওয়ার আশায় অনেকেই নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি এবং টাকা তুলে দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা কার্ড পাননি। বরং বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও তাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ও কাগজপত্র ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের পর ভুক্তভোগীদের কয়েকজন চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। তাদের দাবি, সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, ইউএনওর কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগের নথি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য নির্ধারিত কোনো সরকারি সুবিধা পাওয়ার আশায় টাকা ও ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার পর সেটির কী হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট নারীরা এখন পরিষ্কার ব্যাখ্যা চান।

জোরপুকুরিয়া গ্রামের রাশিদা বেগম অভিযোগ করেন, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে বিএনপি কর্মী আবুল হোসেন তার কাছ থেকে এবং তার দুই পুত্রবধূর কাছ থেকে ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে নেন। রাশিদার ভাষ্য অনুযায়ী, কার্ড পাওয়ার আশায় তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টাকা তুলে দিয়েছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকার অন্যদের সঙ্গে আলোচনা হলে একইভাবে আরও অনেকে টাকা ও কাগজপত্র দেওয়ার কথা জানান।

রাশিদা বেগমের মতো জামিরাপাড়া ও ছেঙ্গাছিয়া গ্রামের আয়েশা, হালিমা ও নূরজাহানসহ কয়েকজন নারীও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার আশায় তারা টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্ড হাতে পাননি। ফলে তারা বুঝতে পারছেন না, তাদের দেওয়া টাকা ও কাগজপত্র কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং আদৌ তারা সরকারি কোনো কর্মসূচির আওতায় আসবেন কি না।

অভিযোগের বিষয়ে মহিচাইল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খোরশেদ আলম টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে টাকা নেননি। জোরপুকুরিয়া গ্রামের আবুল হোসেনের কথামতো ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কাগজপত্র ও টাকা সংগ্রহ করেছেন বলে জানান তিনি। চান্দিনা সদরে যাতায়াত এবং অনলাইনে আবেদন করার খরচ হিসেবে ওই টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন খোরশেদ আলম।

অন্যদিকে অভিযুক্ত বিএনপি কর্মী আবুল হোসেনও টাকা ও কাগজপত্র নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি গ্রাম থেকে মোট ৫৯টি আবেদনের জন্য কাগজপত্র ও টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ওই টাকা ও কাগজপত্র এখনো তার কাছেই রয়েছে। যারা টাকা ফেরত চাইবেন, তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তবে চান্দিনায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি আদৌ চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে আবুল হোসেনের বক্তব্য, তিনি আগে থেকেই কাগজপত্র ও টাকা সংগ্রহ করে রেখেছেন এবং কর্মসূচি চালু হলে তখন কার্ড দেওয়া হবে। তার এই বক্তব্যের পর ভুক্তভোগীদের মধ্যে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—সরকারি কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু না হলে কেন তাদের কাছ থেকে টাকা ও ব্যক্তিগত কাগজপত্র নেওয়া হলো।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়েছে। মহিচাইল ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, খোরশেদ আলম ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হলেও আবুল হোসেনের দলের কোনো পদ-পদবি নেই। তারা যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে থাকেন, তাহলে দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে তার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ঘটনাটি ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে দরিদ্র নারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি সংগ্রহের বিষয়টি। জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথির অনুলিপি অন্যের কাছে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো সরকারি সুবিধা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নামে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার যথাযথ যাচাই থাকা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সরকারি সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তার কোনো কর্মসূচির নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করা দরকার। কারণ দরিদ্র পরিবারের অনেক মানুষ সরকারি সহায়তার আশায় নিজেদের সীমিত আয় থেকে টাকা খরচ করেন। একটি কার্ড বা সরকারি সুবিধা পাওয়ার আশায় ৫০০ টাকা দেওয়া কোনো কোনো পরিবারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

এই ঘটনায় ৫৯ নারীর কাছ থেকে মোট ২৯ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযুক্তদের বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থগুলো আবেদন ও যাতায়াতসংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়েছিল এবং টাকা এখনো তাদের কাছে রয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা কী, টাকা কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সঙ্গে এর কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল কি না এবং ভুক্তভোগীদের কাগজপত্র কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা কার্ড পাওয়ার আশায় টাকা ও কাগজপত্র দিয়েছেন। এখন তাদের প্রধান প্রত্যাশা, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং তাদের দেওয়া অর্থ ও নথিপত্রের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মসূচির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন।

চান্দিনা উপজেলা প্রশাসন অভিযোগটি তদন্তের কথা জানিয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, টাকা নেওয়ার উদ্দেশ্য, সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবির নিরাপত্তার বিষয়গুলো স্পষ্ট হলে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের অর্থ ও নথিপত্র ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট নারীদের।

ঘটনাটি তাই শুধু টাকা নেওয়ার অভিযোগ হিসেবে নয়, সরকারি সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা অসহায় মানুষের আস্থা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। দরিদ্র মানুষের জন্য নির্ধারিত কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাবের বাইরে স্বচ্ছ ও সরকারি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই হতে পারে এমন অভিযোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত