প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা ছয় দিন বঙ্গোপসাগরে ঘুরেও ইলিশের দেখা মিলছিল না। জাল ফেলেছেন, অপেক্ষা করেছেন, সাগরের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটেছেন—কিন্তু প্রত্যাশিত মাছের দেখা পাননি কক্সবাজারের মাছ ধরার ট্রলার এফভি কুলসুমার ১২ জেলে। একপর্যায়ে যখন প্রায় নিরাশ হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি, তখনই যেন বদলে গেল ভাগ্য। ষষ্ঠ দিনের জালে উঠে এলো বিপুলসংখ্যক ইলিশ। শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ২০০টি ইলিশ নিয়ে কক্সবাজারের নুনিয়াছটা ঘাটে ফিরল ট্রলারটি। পরে এসব ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।
সোমবার সকাল আটটার দিকে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ঘাটে এসে ভিড়ে এফভি কুলসুমা। দীর্ঘ সাত দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে ট্রলারটি ঘাটে পৌঁছানোর পরপরই শুরু হয় মাছ নামানোর ব্যস্ততা। ট্রলারের ডেকে তখন ইলিশের পাশাপাশি পোপা, মাইট্যা, রুপচাঁদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। জেলেরা দ্রুত মাছগুলো ঝুড়িতে ভরে পাশের ফিশারিঘাটের পাইকারি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে নিয়ে যেতে থাকেন।
ঘাটে মাছ পৌঁছানোর পর খুব বেশি সময় লাগেনি নিলাম ও বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হতে। কয়েকজন ব্যবসায়ী কুলসুমার ২ হাজার ২০০ ইলিশ কিনে নেন ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। এসব ইলিশের প্রতিটির ওজন ছিল আনুমানিক ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। বিক্রি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রমিকেরা মাছগুলো বরফমিশ্রিত কার্টনে ভরে ট্রাকে তোলেন। পরে দুপুরের দিকে মাছভর্তি ট্রাক ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।
কুলসুমার জালে এত বিপুল ইলিশ ধরা পড়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ফিশারিঘাটে। মৌসুমের অন্য সময়ের তুলনায় একসঙ্গে এত বেশি ইলিশ পাওয়ার ঘটনা ব্যবসায়ী ও জেলেদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে। ট্রলারের জেলেরাও ছিলেন উচ্ছ্বসিত। দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়ায় তাঁদের মুখে স্বস্তির ছাপ দেখা যায়।
ট্রলারটির মালিক নুনিয়াছটার বাসিন্দা আমান উল্লাহ, বয়স ৫৪ বছর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে কক্সবাজারের জেলেদের জন্য সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। সাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ ও লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক সময় ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে জেলেরা যেমন মাছ ধরতে পারেননি, তেমনি ট্রলার মালিকদেরও বাড়তে থাকে আর্থিক চাপ।
আমান উল্লাহ জানান, গত তিন মাসে কক্সবাজারের জেলেরা ইলিশের দেখা খুব কম পেয়েছেন। গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে কিছু ট্রলারে ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়তে শুরু করলেও কুলসুমার মতো এত বড় চালান পাওয়ার আশা তাঁরা করেননি। শেষ মুহূর্তে এত মাছ ধরা পড়ায় তাঁদের দীর্ঘদিনের হতাশার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
কুলসুমার জেলেরা মহেশখালীর তাজিয়াকাটা এলাকা থেকে পশ্চিম দিকে বঙ্গোপসাগরের প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে জাল ফেলেছিলেন বলে জানান ট্রলার মালিক। সেখানেই বড় জালের মুখে আসে ইলিশের ঝাঁক। তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে ইলিশের উপস্থিতি থাকলেও ছোট ট্রলার নিয়ে অনেক দূরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সমুদ্রের আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হলে ছোট ট্রলারের জেলেদের জন্য বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়।
ট্রলারের জেলে মো. আলমগীরের কাছে কুলসুমার এই যাত্রা ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া এক বড় স্বস্তির গল্প। তিনি জানান, টানা পাঁচ দিন সাগরের বিভিন্ন এলাকায় জাল ফেলেও তাঁরা ইলিশের নাগাল পাননি। ষষ্ঠ দিনে মহেশখালী উপকূলের কাছে জাল ফেলতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। একের পর এক ইলিশ জালে উঠতে থাকায় কিছু সময়ের মধ্যেই তাঁরা বিপুল পরিমাণ মাছ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
১২ জেলের প্রত্যেকেই ইলিশ বিক্রির অর্থ থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে পাওয়ার আশা করছেন। তাঁদের কাছে এই অর্থ পুরো মৌসুমের খরচ মেটানোর জন্য বড় কোনো অঙ্ক নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন মাছ না পাওয়ার পর এক ট্রিপে এমন আয় তাঁদের জন্য স্বস্তির। জেলেদের জীবনে সমুদ্রযাত্রার প্রতিটি দিন যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি প্রতিটি ভালো মাছের চালান তাঁদের সংসারে কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তা এনে দেয়।
এদিকে কক্সবাজারের ফিশারিঘাটে সোমবার বিভিন্ন আকারের ইলিশের বেচাকেনা হয়েছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারিতে প্রতি কেজি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা। ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ছিল ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঘাটে আসা বেশির ভাগ ইলিশ ছিল মাঝারি আকারের। এর মধ্যে অনেক মাছের পেটে ডিম রয়েছে বলেও জেলে ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের বাজারেও কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।
ফিশারিঘাটে ওই দিন প্রায় ২৭ জন মাছ ব্যবসায়ীকে দেখা যায়। তাঁরা ট্রলার থেকে মাছ কিনে বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করে ঢাকার বাজারে পাঠাচ্ছিলেন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত কয়েক দিনে অন্তত তিন শতাধিক ট্রলার ফিশারিঘাটে এসেছে। প্রতিটি ট্রলারে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি ইলিশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুলসুমার জালে ধরা পড়া ইলিশের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি।
কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত দুই মাস জেলেরা নিয়মিত সাগরে যেতে পারেননি। এতে বাজারে মাছের সরবরাহ কমেছে। তবে গত পাঁচ-ছয় দিনে ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে। কুলসুমার মতো বড় চালান পাওয়া যাওয়াকে তিনি আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন।
তবে একটি ট্রলারে বিপুল মাছ ধরা পড়ার বিপরীতে সামগ্রিক চিত্র খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ছোট-বড় প্রায় ৬ হাজার মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে প্রায় ৪ হাজারই ঘাটে পড়ে আছে। বাকি প্রায় ২ হাজার ট্রলার সাগরে গেলেও প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশ বা অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ পাচ্ছে না।
ট্রলার মালিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে যাত্রাপ্রতি ব্যয়ের কারণে। সাত দিনের একটি ট্রিপে একটি ট্রলারের খরচ হতে পারে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। অথচ অনেক ক্ষেত্রে মাছ বিক্রি করে আয় হচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৩ লাখ টাকা। ফলে নিয়মিত লোকসানের মুখে পড়ছেন মালিকেরা। দীর্ঘদিনের লোকসান সামলাতে না পেরে কেউ কেউ ট্রলার বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জেলেদের ওপর। কক্সবাজার জেলায় জেলের সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজারের বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য। মাছ কমে গেলে তাঁদের আয় কমে যায়, অথচ সংসারের ব্যয় কমে না। ফলে একটি ভালো মাছের চালান তাঁদের কাছে শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদি কিছু কারণের কথাও তুলে ধরছেন। কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হকের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পরিবেশে পরিবর্তন ঘটছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক দূষণ বাড়ছে। নদী ও উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিক, পরিত্যক্ত জালসহ নানা ধরনের বর্জ্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করছে।
তাঁর মতে, ক্ষতিকর ও অনিয়ন্ত্রিত জালের ব্যবহার বাড়ায় মাছের ডিম ও পোনা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদের ওপর চাপ তৈরি হয়। সমুদ্রে যে পরিমাণ মাছের মজুত রয়েছে, তার তুলনায় অতিরিক্ত আহরণ হলে স্বাভাবিকভাবেই মাছের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের পরিসংখ্যানেও সামুদ্রিক মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেখানে মোট মাছ অবতরণ হয়েছে ২ হাজার ৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইলিশের পরিমাণ ছিল ৫২২ টন। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট মাছ অবতরণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬৫৮ টন, যার মধ্যে ইলিশ ছিল ১ হাজার ৬২৮ টন।
গত কয়েক বছরের তথ্যেও ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের আহরণে চাপের বিষয়টি সামনে এসেছে। জেলার টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াতেও ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের বেচাকেনা হয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জেলায় ২০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ আহরণ হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই থেকে আড়াই মাসে আহরণ ৫০০ মেট্রিক টনেও পৌঁছায়নি।
এই পরিস্থিতিতে এফভি কুলসুমার ২ হাজার ২০০ ইলিশ ধরা পড়া জেলেদের জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। ছয় দিনের দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া সেই মাছ তাঁদের হাতে এনে দিয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে বড় স্বস্তি। কিন্তু একটি ট্রলারের সাফল্যের আড়ালে থাকা সামগ্রিক সংকটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জেলেদের নিরাপদ সমুদ্রযাত্রা, টেকসই মাছ আহরণ, সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটানো কঠিন হতে পারে।
কুলসুমার জেলেরা তাই শেষ দিনের সেই সৌভাগ্যকে মনে রাখবেন অনেক দিন। পাঁচ দিন অপেক্ষার পর ষষ্ঠ দিনের জালে উঠে আসা ইলিশ তাঁদের জন্য শুধু ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি চালান নয়; বরং অনিশ্চিত সমুদ্রজীবনে নতুন করে আশাবাদী হওয়ার একটি মুহূর্ত।