ঢাকার দুই সিটিতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
ঢাকার দুই সিটিতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছে আলোচনা। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থী ও দলীয় সমর্থনের বিষয়টি নিয়েও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। এখন পর্যন্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরাসরি দুই সিটিতে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও দল দুটির পছন্দের প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। সবকিছু শেষ পর্যন্ত বর্তমান অবস্থায় থাকলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে তিন রাজনৈতিক শক্তির প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ব্যালটে রাজনৈতিক দলের প্রতীক থাকবে না। ফলে বিএনপি ও জামায়াত সরাসরি দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ার পরিবর্তে পছন্দের ব্যক্তিকে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিতে পারে। অন্যদিকে এনসিপি ইতিমধ্যেই তাদের প্রার্থীদের নাম প্রকাশ্যে জানিয়েছে। এতে দলীয় প্রতীক না থাকলেও ভোটের মাঠে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি, সমর্থন এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং ঢাকা দক্ষিণে মো. আবদুস সালামের নাম প্রায় চূড়ান্ত। গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁদের দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার বিষয়টিও তাঁদের সামনে ছিল বলে দলীয় সূত্রের ভাষ্য।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এরই মধ্যে নাগরিক সেবা ও নগর ব্যবস্থাপনায় নিজের কার্যক্রম তুলে ধরছেন। তিনি জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার আগে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে কাজ করার চেষ্টা করছেন তিনি। নাগরিকদের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে সমর্থনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। দলের একজন দায়িত্বশীল নেতার ভাষ্য, আপাতত শফিকুল ইসলাম খান ও আবদুস সালামের অবস্থান শক্ত হলেও শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন অসম্ভব নয়। প্রার্থী বাছাইয়ের আগে বিভিন্ন পর্যায়ে জরিপ ও মতামত নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে না আসা পর্যন্ত পুরো বিষয়টিকে সম্ভাব্য হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। দলটি ঢাকা উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে মো. আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত, তাঁদের সমর্থন দিতে পারে বলে জানা গেছে। সেলিম উদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নগরভিত্তিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

সেলিম উদ্দিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। তিনি সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। যদিও সেই নির্বাচনে তিনি জয়ী হতে পারেননি। এবার ঢাকার উত্তরের মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম সামনে আসায় তাঁর সাংগঠনিক পরিচিতি ও নগরভিত্তিক কর্মকাণ্ডই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী সাদিক কায়েমের রাজনৈতিক পরিচিতি কিছুটা ভিন্ন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে পরিচিত। এর আগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য। ডাকসুর দায়িত্বে থাকার কারণে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা কিছুটা সীমিত ও সতর্কভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যেও দুই সিটিতে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতেও প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।

অন্যদিকে এনসিপি এবার অপেক্ষাকৃত ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। দলটি ঢাকা উত্তর সিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণ সিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সরাসরি ঘোষণা করেছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি তাঁদের নাম ঘোষণা করেন। ফলে দুই সিটিতে এনসিপির অবস্থান অন্য দুই দলের তুলনায় প্রকাশ্য ও স্পষ্ট।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার জন্য এটি হবে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পরীক্ষা। এর আগে তিনি সংসদ কিংবা স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি মূলত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত। সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে এবার সেই পরিচিতি ভোটের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ক্ষেত্রে অবশ্য সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা আব্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণা হওয়ায় জাতীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতাকে তিনি নগর নির্বাচনের মাঠে কাজে লাগাতে পারবেন কি না, সেটিও আলোচনায় রয়েছে।

সিটি নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দুই প্রার্থীর ভোটার এলাকাতেও পরিবর্তন এসেছে। আসিফ মাহমুদ উত্তর সিটির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দক্ষিণ সিটির ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হয়েছেন। এরপর তাঁদের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। ফলে এনসিপির নির্বাচনী প্রস্তুতি যে কেবল সাংগঠনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রার্থী-কেন্দ্রিক প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এবারের নির্বাচন আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তিন সম্ভাব্য রাজনৈতিক শক্তির প্রার্থীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচিতি এক ধরনের নয়। বিএনপি তুলনামূলকভাবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সামনে আনছে। জামায়াতের উত্তর সিটির সম্ভাব্য প্রার্থী নগর সংগঠনের পরিচিত নেতা, আর দক্ষিণের সম্ভাব্য প্রার্থী ছাত্ররাজনীতির আলোচিত মুখ। এনসিপি আবার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত পরিচিত দুই ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছে।

এ কারণে ভোটের মাঠে একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে। একদিকে থাকবে বড় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি ও দীর্ঘদিনের ভোটভিত্তি। অন্যদিকে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, নগরবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ, নাগরিক সেবা সম্পর্কে তাঁদের ধারণা এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি ও স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠন বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, বিএনপি সরাসরি কোনো প্রার্থীকে দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেবে না। তবে স্থানীয়ভাবে যিনি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য, তাঁকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার জন্য তৃণমূলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, দলটি আনুষ্ঠানিক প্রতীক না থাকলেও সমর্থন ও সাংগঠনিক প্রভাবকে নির্বাচনে কাজে লাগানোর পথেই এগোতে পারে।

অন্যদিকে জামায়াতও নিজেদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। এনসিপির প্রার্থীরাও নির্বাচনী মাঠে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন। ফলে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগেই রাজধানীর দুই সিটিতে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন শুধু স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাজধানীর মেয়র নির্বাচন সাধারণত জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তিনটি রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান যদি শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে দুই সিটিতে ভোটের লড়াই একই সঙ্গে নগর পরিচালনার সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত কে কতটা ভোটারকে আকৃষ্ট করতে পারেন, কার সাংগঠনিক শক্তি মাঠে বেশি কার্যকর হয় এবং নাগরিকদের কাছে কোন প্রার্থীর নগর উন্নয়ন ও সেবা-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বেশি গ্রহণযোগ্য হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নির্বাচনের ফল। তবে নির্বাচন এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় না যাওয়ায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। ফলে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনী মাঠে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার যে আভাস তৈরি হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজধানীবাসীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত