ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মামলার রায় আজ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৯ বার
ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মামলার রায় আজ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির রায় আজ মঙ্গলবার ঘোষণা করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন। বহুল আলোচিত এ মামলার রায়কে ঘিরে আদালতপাড়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলার রায় ঘোষণা করবেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, বিপুল সাক্ষ্যপ্রমাণ, অডিও-ভিডিও এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনের ওপর শুনানি শেষে মামলাটি এখন রায়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এ মামলার অপর আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, জুলাই আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছিল। এসব ঘটনায় হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ আনা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য ও নথিপত্র তারা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

সোমবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম জানান, মামলায় মোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আসামিদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। এসব অডিওর ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং সেগুলোর সমর্থনে অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য, এসব সাক্ষ্য ও নথি বিশ্লেষণ করলে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়। তাদের দাবি, অপরাধ সংঘটনের প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক আসামির ভূমিকা সম্পর্কে আদালতে প্রয়োজনীয় প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। ফলে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে প্রত্যাশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

তবে আসামিপক্ষ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাদের প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বিচার চলাকালে আসামিপক্ষ রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও তত্ত্বের বিভিন্ন অংশের বিরোধিতা করে তাদের খালাস দাবি করেছে।

এর আগে গত ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। সেদিনই ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে প্রথমে আইনগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। এ নির্দেশনার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি ও হামলার ঘটনা ঘটে এবং বহু মানুষ হতাহত হন বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অডিও ও ভিডিও রেকর্ডকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়।

অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী এম হাসান ইমাম রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেন, তার মক্কেলরা জনগণের জানমাল রক্ষার উদ্দেশ্যে গুলি করার নির্দেশের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাদের কেউই এমন কোনো কমান্ডিং অবস্থানে ছিলেন না, যেখান থেকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।

আসামিপক্ষের এই আইনজীবী কমান্ড রেসপনসিবিলিটির প্রশ্নে মূল দায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর বর্তায় বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য ছিল, তার তিন মক্কেল কাউকে হত্যা করেননি এবং হত্যার নির্দেশও দেননি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে দায় আরোপের আইনগত ভিত্তি নেই এবং তাদের খালাস দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার মক্কেল সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম নেই।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অন্যরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন—রাষ্ট্রপক্ষের এমন অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তার দাবি, আন্দোলনের সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে তাদের পক্ষে অধীনস্থ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

নারীদের আহত হওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে উঠে এলেও মামলায় কোনো নারী সাক্ষী হাজির করা হয়নি বলেও যুক্তি দেন এই আইনজীবী। সাক্ষ্যপ্রমাণে তার মক্কেলদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি দাবি করে তিনি চার নেতার খালাস প্রার্থনা করেন।

আসামিপক্ষের যুক্তির জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ বা যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগের নীতির কথা তুলে ধরে। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীমের দাবি, একই উদ্দেশ্যে কোনো গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ করলে সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও ওই অপরাধমূলক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আইনের আওতায় দায়ী হতে পারেন।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওবায়দুল কাদের প্রথমে ছাত্রলীগকে নির্দেশনা দেন এবং এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও তারা দাবি করে। যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও এ মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে প্রসিকিউশন জানায়।

প্রসিকিউটর তামীম আরও দাবি করেন, এসব কথোপকথনে যুবলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে মাঠে থেকে হামলার দিকনির্দেশনা দিতে দেখা গেছে বলেও রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা ও আইনি মূল্যায়ন এখন ট্রাইব্যুনালের রায়ে নির্ধারিত হবে।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াটিও ছিল দীর্ঘ ও ধারাবাহিক। মামলাটি প্রথমে ৫/২০২৫ নম্বর মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত বছরের ১৮ জুন তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। সেখানে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট নয়টি অভিযোগ আনা হয়।

একই দিনে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এবং একই দিন থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ পর্যায়ক্রমে ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২ আগস্ট। এরপর ৪ আগস্ট থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়। উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে ১৭ আগস্ট মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। প্রায় সাত মাসের বিচারিক প্রক্রিয়ার পর আজ সেই মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে।

রায় ঘোষণার আগে দুই পক্ষের বক্তব্যে মামলাটির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপক্ষ যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা করছে, সেখানে আসামিপক্ষ তাদের মক্কেলদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে খালাস চেয়েছে। ফলে আজকের রায়ে ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য, নথি, অডিও-ভিডিও, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং উভয় পক্ষের আইনগত যুক্তি কীভাবে মূল্যায়ন করেন, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জুলাই আন্দোলনের সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায় নির্ধারণ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মামলার রায় শুধু সংশ্লিষ্ট আসামিদের জন্য নয়, জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত কে কোন অভিযোগে কতটা দায়ী—তা নির্ধারণের এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের। আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে সেই বিচারিক মূল্যায়নই সামনে আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত