প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের নির্মাণাধীন লিফটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক, হুড়োহুড়ি এবং মৃত্যুর খবর নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার সকালে কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইনউদ্দীন খান, ফায়ার সার্ভিসের একজন সহকারী পরিচালক, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং গণপূর্ত বিভাগের বিদ্যুৎ বিভাগের একজন প্রকৌশলী। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ঘটনার সময় হাসপাতালের পরিস্থিতি, রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কারণ এবং মৃত্যুর বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা যাচাই করে কমিটি প্রতিবেদন দেবে বলে জানা গেছে।
সোমবার সন্ধ্যার পর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের নির্মাণাধীন একটি লিফটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের ভেতরে রোগী, স্বজন ও উপস্থিত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির সৃষ্টি হয় এবং কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে একজন শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাসপাতাল এবং এর আশপাশে উদ্বেগ আরও বাড়ে। স্বজনদের মধ্যে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে হাসপাতালে যোগাযোগ ও ছুটে আসার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
তবে পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৃত্যুর সংখ্যা ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। অগ্নিকাণ্ডের পর চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রশাসন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছয়জনের মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে প্রশাসনের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়।
ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে এসব মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ঘটনার পর রাতে ময়মনসিংহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতি, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রোগী ও স্বজনদের চলাচল এবং মৃত্যুর খবরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করে। সেখানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মী অবস্থান করেন। অনেক রোগী শারীরিকভাবে দুর্বল থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনায় আগুনের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন বা লিফট এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে আগুনের উৎস, বৈদ্যুতিক সংযোগ, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণে তদন্ত কমিটিতে হাসপাতাল প্রশাসনের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে। এতে অগ্নিকাণ্ডের কারিগরি ও প্রশাসনিক উভয় দিক পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সময় কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসার প্রত্যাশা রয়েছে। একই সঙ্গে ছয়জনের মৃত্যুর যে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটির উৎস ও সত্যতা, পরে পাওয়া চারজনের মৃত্যুর তথ্য এবং তাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবার নিশ্চিত করেছে। অন্য দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত না হওয়ায় চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি, হাসপাতালের রেকর্ড এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনার পরই বোঝা সম্ভব হবে, অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে কোনো মৃত্যুর সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না।
অন্যদিকে, অগ্নিকাণ্ডের পর হুড়োহুড়িতে আহত ব্যক্তিদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালের ভেতরে রোগী ও স্বজনদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, কোথায় আতঙ্ক বেশি ছড়িয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন—তদন্ত কমিটি এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে পারে।
ঘটনাটি আবারও হাসপাতালসহ জনসমাগমপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সামনে এনেছে। একটি ছোট আগুনও মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। আর আতঙ্কের মধ্যে মানুষ যখন একসঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করেন, তখন পদদলিত হওয়া, পড়ে গিয়ে আহত হওয়া কিংবা অন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই অগ্নিনিরাপত্তা শুধু আগুন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জরুরি সময়ে মানুষকে সুশৃঙ্খলভাবে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে মৃত্যুর খবর নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে স্বজনদের মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকায় বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির দিকেও নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া মৃত্যুর সংখ্যা বা ঘটনার কারণ ছড়িয়ে না দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় কোনো দুর্ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তাই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শুধু আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানের বিষয় নয়, বরং জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কতটা প্রস্তুত, রোগী ও স্বজনদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা কতটুকু এবং মৃত্যুর খবরের প্রকৃত সত্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপরই এখন অনেকটা নির্ভর করছে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়ার বিষয়টি।