প্রকাশ: ১২ আগস্ট’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের পাহাড়ি ঢলে উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানির চাপ ও বর্ষাজনিত প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে প্রমত্তা পদ্মার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে রাজশাহী অঞ্চলে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, রাজশাহীতে পদ্মার পানি বৃদ্ধির এই ধারা শুরু হয় চলতি বছরের ২৪ জুলাই, যখন পানির উচ্চতা ছিল ১৬ দশমিক ৩৫ মিটার। কিছুদিনের জন্য সামান্য হ্রাস পেলেও ৩১ জুলাই থেকে আবারও পানির স্তর বাড়তে থাকে। ১০ আগস্ট সকাল ৬টায় তা দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ১৩ মিটার, যা একইদিন সন্ধ্যায় বেড়ে হয় ১৭ দশমিক ২২ মিটার। ১১ আগস্ট সকালে তা পৌঁছে যায় ১৭ দশমিক ৩২ মিটারে এবং সন্ধ্যায় ১৭ দশমিক ৩৯ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় রাজশাহী পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৪৩ মিটার, যা বিপদসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটারের মাত্র ০ দশমিক ৬৬ মিটার নিচে।
হঠাৎ পানির এই বৃদ্ধি রাজশাহী ও সংলগ্ন চরের বাসিন্দাদের জন্য নতুন দুর্ভোগ বয়ে এনেছে। চর খিদিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমি ও উঁচু চরভূমি পানিতে ডুবে গেছে। চর খিদিরপুরের বাসিন্দা মাসুদ জানান, হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় গবাদিপশু ও মালামাল দ্রুত লোকালয়ে সরিয়ে আনতে হয়েছে। তবে গোখাদ্যের অভাব এখন বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রাকিব বলেন, প্রতিদিন নৌকায় করে মানুষজন মালপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ বা ভাড়া বাসায়। কিন্তু এখনও অনেক গবাদিপশু চরাঞ্চলে আটকে আছে, যাদের সরাতে গিয়ে অনেকে চরম সমস্যায় পড়ছেন।
পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সহিদুল ইসলাম জানান, অনেকের বাড়ির কাছেই পানি পৌঁছে গেছে। গবাদিপশু নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখন সবচেয়ে বেশি। নদীপাড়ের বুলনপুর এলাকার বাসিন্দা সাদেক আলী মাস্টার বলেন, বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি বেড়ে উজান থেকে কুচুরিপানা ভেসে আসে, যা বছরের অন্য সময় দেখা যায় না। বর্তমানে নদীতে ভাসমান কুচুরিপানার পাশাপাশি উজান থেকে আসা তীব্র স্রোতও নদী ও চরাঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাজশাহী নগরীর পদ্মারপাড়ের মাঝি আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্ষা এলেই ফারাক্কার সব গেট খুলে ভারতের উঠানের পানি বাংলাদেশে ছেড়ে দিয়ে প্রতি বছরই জানমালের বড় ক্ষতি করে যাচ্ছে। কিন্তু বছরের পর বছর গেলেও পানি ব্যবস্থাপনায় কোনও কার্যকর পরিবর্তন আসছে না।
গোদাগাড়ী উপজেলার আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের মেম্বার জোহরুর ইসলাম জানান, পদ্মায় পানি বৃদ্ধির গতি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে এবং নদীপাড়ের হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পাউবোর গেজ রিডার এনামুল হক জানান, পানির উচ্চতা বিপদসীমার অতি কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় টি-বাঁধ এলাকায় প্রবেশ ও পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নদীর পাড় সংলগ্ন ব্যবসায়ী ও দোকানিদের নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাজশাহীসহ পদ্মাপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার পানি একসঙ্গে মিশে প্রমত্তা পদ্মাকে বিপদসীমার কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে, যা শুধু কৃষিজমি নয়, মানুষের বসতবাড়ি ও অবকাঠামোকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, তবে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে উজান অঞ্চলের পানির প্রবাহের ওপর।