প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে ঘটেছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন স্থানীয় এক হোটেল ব্যবসায়ী। জানা গেছে, উপজেলার বালিপাড়া বাজারের পরিচিত হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুল বারেক শেখ (৫০) শনিবার রাতে নিজের হোটেলে রেফ্রিজারেটর মেরামতের চেষ্টা করছিলেন। সেই সময় হঠাৎই তিনি বিদ্যুতায়িত হন। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, ততক্ষণে বারেক শেখ আর বেঁচে নেই। এভাবেই প্রাণহীন হয়ে পড়েন একজন পরিশ্রমী মানুষ, যিনি প্রতিদিনের জীবনে পরিবারের সবার ভরসার স্থল ছিলেন।
নিহত আব্দুল বারেক শেখের বাড়ি পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের মধ্য বালিপাড়া গ্রামে। তিনি মৃত আব্দুল হাকিম শেখের ছেলে। এলাকার সবাই তাকে চিনতেন একজন পরিশ্রমী, সৎ এবং সহজ-সরল ব্যবসায়ী হিসেবে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি নিজের হোটেলের কাজ শেষ করেছিলেন। তবে হোটেলের রেফ্রিজারেটরটি হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে তিনি নিজেই সেটি ঠিক করার উদ্যোগ নেন। অভিজ্ঞতা ছাড়াই বৈদ্যুতিক যন্ত্রে হাত দেওয়াই হয়ে ওঠে তার মৃত্যুর কারণ।
নিহতের ছেলে মো. শাওন শেখ চোখের জল সামলাতে সামলাতে স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, “আমার বাবা হোটেলে ফ্রিজটা মেরামত করছিলেন। তখনই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। আমরা চেষ্টা করেছিলাম দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিতে, কিন্তু ডাক্তার বললেন, বাবাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।” পরিবারের এই আকস্মিক শোক তাদেরকে যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে।
এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে হোটেল ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন বারেক শেখ। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হোটেলের কাজ সামলাতেন তিনি। তার অনুপস্থিতিতে এখন সেই হোটেল কেমন চলবে—এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও।
ইন্দুরকানী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মারুফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।” পুলিশের এ বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়, পরিবারের শোকের মুহূর্তে আইনি কোনো জটিলতা তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু নতুন কিছু নয়। প্রায়ই গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, মানুষ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নিজেরাই মেরামতের চেষ্টা করে। দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান না ডেকে নিজের ঝুঁকি নিজেরাই বাড়িয়ে তোলে। একদিকে সময় বাঁচানো, অন্যদিকে খরচ কমানোর চেষ্টা—এই মানসিকতা অনেক সময়ই প্রাণ কেড়ে নেয়। বিশেষজ্ঞরা সবসময় সতর্ক করে আসছেন যে বৈদ্যুতিক যন্ত্র মেরামতের সময় যথাযথ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত এবং যন্ত্রটি অবশ্যই বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। কিন্তু সচেতনতার অভাবে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে।
পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে এর আগেও এ ধরনের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে কিংবা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের সংস্পর্শে এসে বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে। স্থানীয়রা বলছেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিটি বাজার বা হোটেল-দোকানে নিয়মিত ইলেকট্রিক মেকানিক নিয়োগ দিলে হয়তো এ ধরনের মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
আব্দুল বারেক শেখের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্যই নয়, বরং গোটা এলাকায় এক অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হয়ে এসেছে। তার হোটেলটি ছিল বাজারের নিয়মিত আড্ডাখানা। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সেখানে নাস্তা করত, চা খেত, সময় কাটাত। এখন সেই আসনগুলো যেন শুন্যতায় ভরে গেছে। স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, “বারেক ভাই ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ। তার হোটেলে সবাই খুশি মনে যেত। এমনভাবে চলে যাবেন, তা আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনি।”
ঘটনার পর থেকে নিহতের বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মীরা। পরিবারটি একেবারেই ভেঙে পড়েছে। হঠাৎ করেই উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে শোকের সঙ্গে সঙ্গে তারা এখন আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখিও দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। স্থানীয় ফেসবুক গ্রুপগুলোতে অনেকে বারেক শেখের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, “বিদ্যুৎ নিয়ে খেলার সুযোগ নেই। আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার।” আবার কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, কেন এখনো গ্রামীণ পর্যায়ে নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়নি।
এ দুর্ঘটনার আলোচনায় উঠে আসছে আরও একটি বিষয়—বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে নিরাপত্তা শিক্ষা। গ্রামাঞ্চলে মানুষ এখন নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করছে, কিন্তু অধিকাংশেরই সঠিকভাবে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জ্ঞান নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যদি স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা যায়, তাহলে হয়তো অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
বারেক শেখের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং একটি সামাজিক বার্তাও বয়ে আনছে। বিদ্যুতের মতো অদৃশ্য শক্তি নিয়ে অসতর্ক হলে তার ফলাফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তারই এক নির্মম উদাহরণ এটি।
সবশেষে, স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার তদন্ত শেষে আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। তবে যারা তাকে চিনতেন, তাদের কাছে বারেক শেখ হয়ে থাকবেন একজন সাধারণ অথচ প্রিয় মানুষ হিসেবে, যিনি কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা চালাতেন এবং পরিবারের স্বপ্ন দেখতেন। হঠাৎ করেই সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে যাওয়ায় চারদিকে নেমে এসেছে বিষাদের কালো মেঘ।