প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে আজ মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হলো নতুন শুল্ক বা ট্যারিফ পদ্ধতি। দীর্ঘ ৩৯ বছর পর বন্দরের সেবামূল্যে বড় ধরনের এই পরিবর্তন এলো সরকারের নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ট্যারিফ গড়ে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলেও, কিছু ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, এই সিদ্ধান্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়াবে।
নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার ফলে পাইলটিং চার্জ নির্ধারিত হয়েছে ৮০০ মার্কিন ডলার, টাগ চার্জ সর্বনিম্ন ৬১৫ ডলার থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৮৩০ ডলার পর্যন্ত। কনটেইনার ওঠা-নামা ও অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রেও ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ পরিবর্তন কার্যকর করার আগে নৌ পরিবহন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাইয়ের পর গত রোববার রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
বন্দর ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা বিষয় হলো, জাহাজের অবস্থানকালীন সময়ের চার্জ। আগে তুলনামূলক সহনীয় হারে আদায় করা হলেও, এখন থেকে ১২ ঘণ্টা অতিরিক্ত অবস্থানের জন্য ১০০ শতাংশ, ২৪ ঘণ্টার জন্য ৩০০ শতাংশ, ৩৬ ঘণ্টার জন্য ৪০০ শতাংশ এবং ৩৬ ঘণ্টার বেশি হলে সর্বোচ্চ ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। শিপিং ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আমদানি খরচকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই পড়বে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ সাংবাদিকদের বলেন, “যে হারে ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছে তা ব্যবসায়ীদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। আমদানি খরচ বাড়লে প্রতিটি খাতে এর প্রভাব পড়বে, যার শেষ প্রান্তে গিয়ে ভোক্তাকেই বেশি মূল্য দিতে হবে।”
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বাড়তি ট্যারিফের প্রভাব এতটা ভয়াবহ হবে না যতটা ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন। তাদের দাবি, প্রতি কেজি কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ আগে যেখানে ৩২ পয়সা ছিল, এখন তা বেড়ে হয়েছে মাত্র ৪৪ পয়সা। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে ১২ পয়সা বাড়ানো হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে সামান্য বৃদ্ধি।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর বছরে প্রায় ৩৩ লাখ কনটেইনার এবং ১৩ কোটি মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করে থাকে। প্রতি বছর ৪ হাজারের বেশি পণ্যবাহী জাহাজ এই বন্দরে আসে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং বন্দর পরিচালনা আরও আধুনিক করতে ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল স্পেনের আইডমকে। তারা এশিয়ার ১০টি ও বিশ্বের আরও কয়েকটি প্রধান বন্দর পর্যালোচনা করে চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন ট্যারিফ কাঠামো প্রস্তাব করে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছিল। চার দশক পর এই নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ায় সরকারের যুক্তি হলো, দীর্ঘদিনের স্থবিরতার কারণে আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এবার সে ঘাটতি পূরণে নতুন ট্যারিফ অপরিহার্য।
নতুন কাঠামোতে আমদানি পণ্য বোঝাই কনটেইনার বন্দরে ফেলে রাখার প্রবণতা রোধ করতেও বাড়তি চার্জ আরোপ করা হয়েছে। আমদানি করা পূর্ণ কনটেইনার (এফসিএল)-এর ক্ষেত্রে প্রথম ৪ দিন, রফতানিযোগ্য এফসিএল এবং এলসিএল কনটেইনারে প্রথম ৬ দিন ফ্রি টাইম দেওয়া হবে। সপ্তম দিন থেকে প্রতি কনটেইনারের জন্য ৬.৯ ডলার চার্জ শুরু হবে এবং ২১ দিন অতিক্রম করলে অতিরিক্ত ৬২ মার্কিন ডলার দিতে হবে। ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হবেন দ্রুত কনটেইনার খালাস করতে, যা বন্দরের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে কাস্টম এজেন্টরা মনে করছেন, হঠাৎ করে এত বড় হারে ট্যারিফ বৃদ্ধি বাস্তবসম্মত নয়। চট্টগ্রাম কাস্টম এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে। তার ভাষায়, “আমরা ট্যারিফ বৃদ্ধির বিরোধী নই, তবে সেটি যেন যৌক্তিক হয়। বর্তমান বৃদ্ধির হার ব্যবসায়ীদের জন্য অস্বাভাবিক।”
চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোগত ঘাটতির কথাও বারবার সামনে আসছে। বর্তমানে বন্দরে গ্যান্টি ক্রেন রয়েছে মাত্র ১৮টি—এর মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ১৪টি এবং চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালে মাত্র ৪টি। অন্যান্য বার্থে পণ্য ওঠানামা করতে হয় জাহাজের নিজস্ব ক্রেন দিয়ে। ফলে কাজের গতি অনেক সময় ব্যাহত হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া শুধু ট্যারিফ বাড়ানো হলে তা হবে অন্যায্য। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, “সেবার মান বাড়াতে হবে, যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। তখন ট্যারিফ বৃদ্ধিকে যৌক্তিক বলা যাবে।”
বিশ্বের শীর্ষ ১০০ ব্যস্ততম বন্দরের তালিকায় বর্তমানে ৬৮তম অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এই বন্দর দিয়েই সম্পন্ন হয়। তাই এখানে ট্যারিফ বৃদ্ধি কেবল বন্দরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়বে। ব্যবসায়ীদের একাংশ মনে করছেন, নতুন এই চার্জ বহন করতে গিয়ে পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়বে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পৌঁছাবে। আবার অপরপক্ষ বলছে, ট্যারিফ বৃদ্ধি সেবার আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একদিকে নতুন ট্যারিফের ফলে বন্দরের আয় বাড়বে, অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানির খরচও কিছুটা বৃদ্ধি পাবে। তবে যদি আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল দিয়ে বন্দরের সেবার মান বাড়ানো যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়ীদেরও লাভ হবে। কেননা, দ্রুত কনটেইনার খালাস এবং সময় বাঁচানো ব্যবসার খরচ কমাতে সাহায্য করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন ট্যারিফ ব্যবস্থা একটি বড় ধরনের পরিবর্তন, যার ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিকই রয়েছে। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের মধ্যে যেমন চাপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তেমনি বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে এটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার একটি পদক্ষেপ। শেষ পর্যন্ত বাস্তবে এর প্রভাব কেমন হবে, তা নির্ভর করবে বন্দরের সেবা কতটা আধুনিক, দক্ষ ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর।