গাজায় ৭২০ দিনের ইসরাইলি হামলায় হারানো শৈশব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৮১ বার
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় ২৪ ঘণ্টায় নিহত ৭২, আহত ৩৫৬, মানবিক সংকট তীব্র

প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত আগ্রাসনের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ৭২০ দিন ধরে চলমান এ ভয়াবহ সহিংসতা একদিকে যেমন অসংখ্য প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, অন্যদিকে শিশুদের জীবনকে করে তুলেছে অকল্পনীয় দুর্বিষহ। এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৬৫ হাজার ৪১৯ জন ফিলিস্তিনি, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দেড় লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় চল্লিশ হাজার শিশুকে অঙ্গহানির মতো ভয়াবহ বাস্তবতার সঙ্গে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডকে এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ‘পঙ্গু শিশুর রাজধানী’ হিসেবে বর্ণনা করছে।

ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজার অন্তত ৪০ হাজার শিশুর অঙ্গচ্ছেদ ঘটেছে। সংস্থাটির কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, গাজার শিশুদের দুর্দশা শুধুমাত্র ক্ষুধা, আঘাত বা মৃত্যু দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যুদ্ধ তাদের শৈশবকে কেড়ে নিচ্ছে আরও গভীর ও অদৃশ্য ক্ষতের মাধ্যমে। দুঃস্বপ্ন, উদ্বেগ, ভীতি, সহিংসতা এবং মানসিক আঘাত তাদের বেড়ে ওঠাকে অব্যাহতভাবে ধ্বংস করছে। অনেককে বাধ্য করা হচ্ছে ভিক্ষা, লুটপাট কিংবা শিশুশ্রমে। শৈশবের এই হারানো অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এক দুঃসহ ট্রমার উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তকারীরা সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন, গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরও ইসরাইলি বাহিনী হামলা অব্যাহত রেখেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যুদ্ধবিরতির আহ্বান বারবার উপেক্ষা করে ইসরাইল নতুন নতুন আক্রমণ চালাচ্ছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।

মাত্র গত একদিনে গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর বিমান ও স্থল হামলায় কমপক্ষে ৮৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা মঙ্গলবারের তুলনায় দ্বিগুণ। নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে একটি স্টেডিয়ামে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো হামলায় অন্তত ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাতজন নারী ও দুই শিশু রয়েছে। আল-আহলি স্টেডিয়ামে আশ্রিত মানুষের ওপরও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া সাধারণ মানুষ সেখানেও নিরাপত্তা পাননি।

গাজায় ত্রাণ পৌঁছানো নিয়েও দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। আন্তর্জাতিক জলসীমায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় গমনরত ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামের নৌবহরে ড্রোন হামলা চালায় ইসরাইল। এর ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে। ইতালি ও স্পেন তাদের যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে ভূমধ্যসাগরে, যাতে ত্রাণবাহী জাহাজগুলো নিরাপদে গাজায় পৌঁছাতে পারে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইডো ক্রোসেটো সংসদে ভাষণ দিয়ে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যেই একটি নৌজাহাজ পাঠানো হয়েছে এবং আরেকটি প্রস্তুত রয়েছে। পরিস্থিতি যেকোনো দিকে মোড় নিলেও তারা প্রস্তুত। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও ঘোষণা দিয়েছেন, তার দেশের নৌবাহিনী ইতালির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে এবং গাজামুখী ত্রাণযাত্রা রক্ষায় অংশ নেবে।

বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো গাজার শিশুদের পরিস্থিতিকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করছে। তাদের মতে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি এতটা ব্যাপক যে, একটি পুরো প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে পড়েছে। চিকিৎসা সুবিধা ভেঙে পড়া, ওষুধের তীব্র সংকট, পরিষ্কার পানি ও খাদ্যের অভাব গাজাকে শিশুদের জন্য অমানবিক কারাগারে পরিণত করেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিদিন শত শত আহত শিশু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসছে। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী নেই। অনেক ক্ষেত্রেই অঙ্গচ্ছেদ ছাড়া বিকল্প থাকে না।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হাসপাতালগুলো ক্রমাগত টার্গেট করা হয়েছে। শিশু হাসপাতাল, মাতৃসদন কিংবা জরুরি সেবাকেন্দ্র কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি। ফলে আহত শিশুদের অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। যাদের বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে, তাদেরও অধিকাংশই আজীবন অঙ্গহীন হয়ে বেঁচে থাকার শাস্তি পাচ্ছে।

শিশুদের মানসিক অবস্থাও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গাজায় কাজ করা আন্তর্জাতিক মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিটি শিশু অন্তত একজন প্রিয়জনকে হারিয়েছে। অনেকেই রাত জেগে দুঃস্বপ্ন দেখে কাঁদছে, আতঙ্কে কেঁপে ওঠছে। কেউ কেউ কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এসব লক্ষণ যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাতের স্পষ্ট নিদর্শন। যদি দ্রুত কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে গাজার শিশুরা প্রজন্মান্তরে গভীর ট্রমা নিয়ে বেড়ে উঠবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

ইসরাইলি বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া থাকলেও তা বাস্তবে খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতির পক্ষে বিপুল ভোটে প্রস্তাব পাস হলেও নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো রাজনীতির কারণে কার্যকর সিদ্ধান্ত আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমা দেশ ইসরাইলকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে, আরব বিশ্ব ও উন্নয়নশীল দেশগুলো যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে বারবার, কিন্তু ইসরাইলের আগ্রাসন কোনোভাবেই থামছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গাজা আজ শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং শিশুদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে অমানবিক আবাসভূমি হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের বোমা, ক্ষুধা, ভয় এবং অঙ্গহানি গাজার শিশুদের জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং শিশু সুরক্ষা কনভেনশন বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তবুও কার্যকর হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতি গাজার ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

ট্রাম্প-এর্দোগান বৈঠক: ২৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে

৭২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই যুদ্ধ বিশ্বকে নতুন করে ভাবাচ্ছে—একটি প্রজন্মের হারানো শৈশবের দায় কি শুধু গাজার মানুষের, নাকি পুরো সভ্য পৃথিবীর? মানবিক বিপর্যয়ের এই চিত্র এখনই থামানো না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসে এক ভয়াবহ দাগ হিসেবে বহন করবে এই ট্র্যাজেডির স্মৃতি।

গাজার রক্তাক্ত বাস্তবতা তাই বিশ্বকে একটাই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—কবে শেষ হবে এই বর্বরতা, আর কবে ফিরবে শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com