আবরার ফাহাদের কবর জিয়ারতে ডাকসু নেতৃবৃন্দ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৮ বার
আবরার ফাহাদের কবর জিয়ারতে ডাকসু নেতৃবৃন্দ: জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শহীদ স্মরণ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ও জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম শহীদ আবরার ফাহাদ। ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামে তাঁর আত্মত্যাগ তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি প্রতীকী শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই আবরার ফাহাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতৃবৃন্দ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে তাঁর সমাধিতে উপস্থিত হন।

ডাকসুর এই জিয়ারত অনুষ্ঠানটি ছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতীয় জীবনে আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের গুরুত্ব পুনরায় স্মরণ করার একটি দৃঢ় অঙ্গীকার। সেখানে উপস্থিত নেতারা আবরার ফাহাদসহ জুলাই বিপ্লবের সকল শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং তাঁদের অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।

জিয়ারতে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, কার্যনির্বাহী সদস্য তাজিনুর রহমান ও কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান উদ্দীন অংশ নেন। আবরারের পিতা বরকত উল্লাহও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সমাধিস্থলে দোয়া ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নেতৃবৃন্দ আবরারের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দীর্ঘ আলাপচারিতায় অংশ নেন। এই সময় পরিবারকে আশ্বস্ত করে তাঁরা বলেন, আবরারের রক্ত বৃথা যায়নি; বরং তাঁর আত্মত্যাগ জাতীয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম আবরারকে বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “শহীদ আবরার ফাহাদ আমাদের প্রেরণার বাতিঘর। খুনী হাসিনার শাসনে আমরা ভারতের অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক দাসত্বের মুখোমুখি হয়েছিলাম। আবরার সেই শোষণ-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর দেখানো পথেই জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। জুলাইয়ের প্রতিটি শহীদ ও গাজী আবরারের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষাই লালন করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আবরারের আত্মত্যাগকে জাতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ৭ অক্টোবরকে ‘জাতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগে এই দিবসটি পালিত হলে তা জাতীয় জীবনে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।”

ডাকসু নেতারা এ সময় জানান, আবরার ফাহাদের স্মৃতি কেবল ছাত্র সমাজের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য এক অবিনশ্বর প্রেরণার উৎস। তাঁর রক্তে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তা আজ জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্মৃতি নতুন প্রজন্মকে আগ্রাসনবিরোধী ও স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে সাহসী করে তুলবে।

আবরার ফাহাদ ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ছাত্র রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তিনি প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। সেদিন থেকে আবরার শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, বরং আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এক প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবছর নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।

জিয়ারতের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডাকসু নেতাদের এই উদ্যোগ কেবল একটি স্মরণ অনুষ্ঠান নয়; বরং বর্তমান প্রজন্মের কাছে আবরারের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁরা বলছেন, আবরারের আত্মত্যাগ যে প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলেছে, সেই চেতনা টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই দায়িত্ব নিতে হবে।

এদিকে আবরারের পরিবারের সদস্যরা ডাকসু নেতাদের উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের সন্তান দেশের মানুষের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা জাতি যদি স্মরণ রাখে তবে সেটাই হবে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

কুষ্টিয়ার গ্রামীণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই জিয়ারত কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণও অংশ নেন। তাঁরা জানান, আবরারের মতো একজন তরুণকে হারানো জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হলেও তাঁর রক্ত বৃথা যায়নি। তাঁর দেখানো পথেই দেশ স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদার সংগ্রামে এগিয়ে যাবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ৭ অক্টোবরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী দিবস’ ঘোষণার দাবি একদিকে আবরারের স্মৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করবে, অন্যদিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইকে আরও জোরদার করবে।

ডাকসু নেতাদের জিয়ারতের এই ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও বাংলাদেশ আজও বৈদেশিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদের চাপের মুখে রয়েছে। এই বাস্তবতায় আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগ এবং তাঁর নামে দিবস ঘোষণার দাবি কেবল একটি স্মরণ অনুষ্ঠান নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা।

ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, আবরারের স্মৃতি কেবল একটি পরিবারের নয়, একটি প্রজন্মের নয়, বরং পুরো জাতির সংগ্রামী ইতিহাসের অংশ। তাঁর সমাধিতে ডাকসু নেতাদের উপস্থিতি সেই ইতিহাসকে আবারও জীবন্ত করে তুলেছে এবং জাতিকে মনে করিয়ে দিয়েছে—শোষণ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত স্বাধীনতার পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com