সর্বশেষ :
ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা, কাঠগড়ায় ইউপি সদস্য আইনগত বাধা কাটল: এমপি হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন সরোয়ার হবিগঞ্জে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, ১৪৪ ধারা জারি ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫০৩ জন মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল বিকলে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট ভারতের মুদ্রায় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চায় রাশিয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুযোগ চায় জামায়াত ড. ইউনূসের পরিকল্পনায় ছিল বিএনপিকে মাইনাস করা: রাশেদ খাঁন সারজিস-পাটওয়ারীর ওপর হামলা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি হবিগঞ্জে হামলার প্রতিবাদে বুধবার রাজপথে নামছে এনসিপি

কক্সবাজারগামী মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজনের করুণ মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
কক্সবাজারগামী মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজনের করুণ মৃত্যু

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কখনও কখনও জীবন এমন এক নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে আনন্দের সব প্রস্তুতি, উৎসবের সব রঙ মুহূর্তেই মিশে যায় শোকে। যেখান থেকে আর ফেরার পথ থাকে না, রয়ে যায় শুধু স্তব্ধ কান্না, হাহাকার আর না ফেরার দেশে চলে যাওয়া প্রিয় মুখগুলোকে স্মরণ করার বেদনা। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের পাটোয়ারী পরিবারের গল্পটিও ঠিক এমনই এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। বহু দিনের অপেক্ষার পর ভালোবাসা, পরিবার আর আনন্দময় সময় কাটানোর উদ্দেশ্যেই তারা রওনা দিয়েছিলেন কক্সবাজারের পথে। কিন্তু সেই পথেই ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত সেই দুর্ভাগ্য। যে যাত্রা শুরু হয়েছিল হাসি-আনন্দ আর স্বপ্ন নিয়ে, ভোরের আলো ফুটতেই তা পরিণত হলো বেদনার কালো অধ্যায়ে। পরিবার হারাল পাঁচজন আপনজনকে, আর দেশ হারাল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির গল্প।

মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের কর্মী উদয় পাটোয়ারী পরিবার নিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন বেশ আগেই। কর্মব্যস্ত জীবনে প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় ছিল না বললেই চলে। তাই এবার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি তিনি। পুরো পরিবারকে নিয়ে হাসিখুশির এক সফর হবে, সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে হারিয়ে যাবে ক্লান্তি—এমনই আনন্দচ্ছলে মঙ্গলবার রাতে মাইক্রোবাসে রওনা দেন তারা। সাথে ছিলেন স্ত্রী ফারজানা মজুমদার লিজা, চার বছর বয়সী সন্তান সামাদ, শ্যালিকা টিজা, শ্যালক লিশান। উত্তরা থেকে যাত্রা শুরু করে পথে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ওঠেন উদয়ের মা রুমি বেগম এবং বোন সাদিয়া পাটোয়ারী। তারপর ফালগুনকরা থেকে ওঠেন শাশুড়ি রিজওয়ানা মজুমদার শিল্পী। নয়জনের এই সফর ছিল একসাথে হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার বিরল সুযোগ। কে জানত এই মিলনযাত্রাই হয়ে উঠবে শেষ দেখা!

বুধবার ভোররাত। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী ঢালা এলাকায় মাইক্রোবাসটি পৌঁছুতেই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই দুর্ঘটনা। বিপরীত দিক থেকে আসা মারসা পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। গাড়িটি মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায়। নিঃশ্বাস ফেলারও সুযোগ পাননি অনেকেই। ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান উদয়ের স্ত্রী লিজা, শাশুড়ি শিল্পী, শ্যালিকা টিজা, মা রুমি বেগম ও বোন সাদিয়া পাটোয়ারী। জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ভ্রমণ আর হলো না তাদের। সেখানে স্বজনদের দুঃস্বপ্নের এক অন্ধকার অধ্যায় রচনার সাক্ষী হলো পুরো দেশ।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। মালুমঘাট খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতাল ও চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় আহতদের। তবে তাদের অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। এখনও জীবনের জন্য লড়ছেন চালকসহ চারজন। কক্সবাজারের পথে আনন্দযাত্রা নতুন স্বপ্নের দুয়ার খুলবে—এমন বরকতই চেয়েছিলেন সবাই। কিন্তু ভাগ্য হঠাৎ করেই ভেসে দিল তাদের সব স্বপ্ন, চুরি করে নিল হাসিমাখা মুহূর্তগুলো।

মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ মেহেদী হাসান নিশ্চিত করেছেন এই করুণ ঘটনার খবর। তার কণ্ঠেও ঝরে পড়ছিল শোকের ভার। তিনি জানান, দুর্ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে উদ্ধারকাজে এসে স্থানীয়রাও চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি। প্রতিদিন বহু যানবাহন যাতায়াত করে এই মহাসড়ক দিয়ে। তবুও এমন মর্মান্তিক ঘটনা যে পরিবারের ওপর কীভাবে বাজ পড়ে, সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলে বোঝা যায় জীবনের অনিশ্চয়তা কতটা নির্মম হতে পারে।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন উদয় পাটোয়ারীর শ্বশুর আবদুল মন্নান মজুমদার। চোখভরা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, “জামাতার উদ্যোগেই সবাই মিলে কক্সবাজার যাচ্ছিল। ওরা খুব খুশি ছিল। ভাবিনি এভাবে ফিরতে হবে।” পরিবারের স্বপ্ন, হাসি আর ভালোবাসার গল্প রূপ নিল নিস্তব্ধতায়। কক্সবাজারের ঢেউয়ে নয়, এখন সে পরিবার স্নান করছে অশ্রুস্রোতে।

সড়ক দুর্ঘটনা আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও, কারও না কারও পরিবার আকস্মিকভাবে ভেঙে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয়জনরা। জীবন যদি হয় সবচেয়ে মূল্যবান, তবে সড়কের এই নির্মম মৃত্যু যেন প্রতিনিয়তই তা ভুল প্রমাণ করে। কোনো অবহেলা, লোভ, তাড়াহুড়া কিংবা দায়িত্বহীনতা মুহূর্তেই কেড়ে নিচ্ছে অগণিত স্বপ্ন, অজস্র নিঃশ্বাস। আজ যে শিশুটি তার মাকে হারিয়েছে, যে স্বামী পুরো পরিবার হারিয়ে শোকে অবশ, যারা মা-বোন হারিয়ে শূন্যতায় দাঁড়িয়ে—তারা আর কোনোদিন ফিরে পাবে না সেই ভালোবাসা, সেই আদর, সেই হাসিমাখা মুখগুলো।

কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা সেই পরিবারটি আজ সংবাদ শিরোনাম। কিন্তু এই শিরোনামের অন্তরালে রয়েছে ছিন্নভিন্ন আবেগ, ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস আর এক অগণিত প্রশ্ন—কেন? মানুষ কি সামান্য আনন্দের খোঁজেও আর নিরাপদ থাকতে পারবে না? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের হাতে। তবে আজ এই মুহূর্তে একটি পরিবারের কান্না, একটি সমাজের শোক, পুরো দেশের বেদনা শুধু এই শেখায়—সড়ক নিরাপত্তা আর অবহেলার জায়গা নেই। জীবনকে যতটা ভালোবাসি, ততটাই গুরুত্ব নিয়ে ভাবতে হবে নিরাপদ যাত্রার বিষয়ে।

বেদনার এই দিনে কক্সবাজারের নীল আকাশ আর অনন্ত সমুদ্রও যেন নীরব বিষণ্নতায় নিমজ্জিত। উদয় পাটোয়ারীর স্বপ্নের ভ্রমণ শেষ হয়েছে শোকার্ত নীরবতায়, তার বাড়িতে আজ শুধু কান্না আর স্মৃতিতে আঁকড়ে ধরা প্রিয় মুখগুলো। যেখানে ছিল হাসির প্রতিশ্রুতি, সেখানে এখন শুধু নিঃসঙ্গতার সাইরেন। এই পরিবারটির প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গভীর সমবেদনা—তাদের জন্য প্রার্থনা, আহতরা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। আর দেশের প্রতিটি যাত্রা যেন হয় নিরাপদ, প্রতিটি পরিবার যেন ঘরে ফেরা পর্যন্ত থাকে নির্ভার ও নিশ্চিন্ত।

এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি পরিবারের নয়, আমাদের পুরো সমাজের এক বড় ক্ষতি। এটি সতর্কবার্তা, স্মরণ করিয়ে দেওয়া—জীবন ক্ষণিক, নিরাপত্তা কোনো বিকল্প নয়। আজকের চোখের পানি আগামী দিনের শিক্ষা হয়ে থাক—প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি যাত্রা, প্রতিটি জীবন যেন পায় যথাযথ গুরুত্ব। মৃত্যুর পথ যেন আর কেউ না বেছে নেয় অজান্তে। স্মৃতি যেন আর না হয় অশ্রুভেজা অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত