এইচ-১বি ভিসা ফি নিয়ে ট্রাম্পের বড় ধাক্কা: বাতিলে রায় আদালতের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ৮৭ বার
এইচ-১বি ভিসা ফি নিয়ে ট্রাম্পের বড় ধাক্কা: বাতিলে রায় আদালতের

প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বরাবরই নানা ধরণের কড়াকড়ি আরোপ করে আসছেন দেশটির নীতিনির্ধারকরা। বিশেষ করে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য আকর্ষণীয় এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির ওপর নানা সময়েই এসেছে পরিবর্তন। তবে সেই ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে এইচ-১বি ভিসার আবেদন ফি নিয়ে যে নাটকীয় ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত আদালতের কাঠগড়ায় মুখ থুবড়ে পড়ল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতের এক ঐতিহাসিক রায়ে ট্রাম্পের ঘোষিত সেই বিতর্কিত ১ লাখ ডলারের আবেদন ফি বাতিল করা হয়েছে। আদালতের এই রায় কেবল অভিবাসন প্রত্যাশী এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্যই স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসেনি, বরং মার্কিন প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বোস্টনের মার্কিন জেলা জজ লিও সোরোকিন এই যুগান্তকারী রায়টি প্রদান করেছেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ২০ জন ডেমোক্র্যাটিক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়ের করা দীর্ঘমেয়াদী একটি আইনি লড়াইয়ের ইতিবাচক সমাপ্তি ঘটল। ঘটনাটির প্রেক্ষাপট ছিল গত সেপ্টেম্বরে, যখন ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষায়িত পেশার বিদেশি কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসার আবেদন ফি এক লাফে ১ লাখ ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, এই ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার রোধ করতে এবং মার্কিন শ্রমবাজারে দেশীয় কর্মীদের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে এই উচ্চ ফি নির্ধারণ করা জরুরি। তবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল বিশেষ করে প্রযুক্তি খাত এবং অভিবাসন আইনজীবীদের মধ্যে। কারণ, গুগল, মাইক্রোসফট বা আমাজনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বড় একটি অংশ বিদেশি মেধাবী কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল।

বিচারক লিও সোরোকিন তার ৪২ পৃষ্ঠার রায়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বিশেষায়িত ক্ষেত্রে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের নিয়োগে কোম্পানিগুলোর ব্যবহৃত এই কর্মসূচির ওপর নতুন এই নীতি আরোপ করার কোনো সাংবিধানিক এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের নেই। বিচারক সোরোকিন তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, এটি ছিল মূলত একটি বেআইনি কর, যার অনুমোদন বা বৈধতা দেওয়ার ক্ষমতা মার্কিন কংগ্রেসের নেই, আর ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই এটি কার্যকর করতে চেয়েছিল। বিচারক মনে করেন, ফেডারেল অভিবাসন নীতিতে এই ধরনের কঠোর এবং ব্যয়বহুল বাধ্যবাধকতা যুক্ত করার একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল আইনপ্রণেতাদের বা কংগ্রেসের রয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলদের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত মামলায় যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, ট্রাম্পের এই একতরফা সিদ্ধান্ত মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছিল এবং বিশ্ববাজারে তাদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিটি এমন সব বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য উন্মুক্ত যারা বিশেষায়িত কোনো ক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং যাদের জ্ঞান ও দক্ষতা মার্কিন অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই ভিসার আবেদনকারীদের সাধারণত একটি স্নাতক ডিগ্রি বা সমমানের যোগ্যতা থাকতে হয় এবং এই ভিসার মেয়াদ সাধারণত তিন বছর হয়ে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে নবায়নযোগ্য। সমালোচকদের মতে, ১ লাখ ডলারের ফি ছিল কার্যত একটি অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা, যার মাধ্যমে বিদেশি মেধাবীদের প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন যখন এই ফি আরোপ করে, তখন তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, এই কর্মসূচিটি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ছে। কিন্তু আদালতের এই রায়ে সেই যুক্তি ধোপে টেকেনি। বিচারক সোরোকিন মনে করেন, আইন প্রণয়নের এই ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের নয়, বরং তা কেবল মার্কিন কংগ্রেসের হাতেই সীমাবদ্ধ।

আদালতের এই রায় প্রযুক্তি খাতে কাজ করা হাজার হাজার বিদেশি পেশাজীবীর জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা কোম্পানিগুলো এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে তাদের আন্তর্জাতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে পারবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ধরনের নীতি গ্রহণের ফলে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতো, কারণ বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আকর্ষণ করার যে সক্ষমতা আমেরিকার ছিল, তা এই ধরণের ফি আরোপের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ সবসময়ই যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি মার্কিন কোম্পানিগুলোকে তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই ফি বাতিল হওয়ার মাধ্যমে মার্কিন প্রযুক্তি খাতের গতিশীলতা আবারো ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই রায়ের ফলে কেবল ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বিতর্কিত অধ্যায়েরই অবসান ঘটল না, বরং এটি মার্কিন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। সোরোকিন, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বিচারক, তিনি তার রায়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে শাসনতন্ত্রের ধারাগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো একতরফা নির্দেশের মাধ্যমে ফেডারেল করের কাঠামো পরিবর্তন করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। এই আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি মার্কিন অভিবাসন আইনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে গণ্য হবে, কারণ এটি ভবিষ্যতে যেকোনো প্রেসিডেন্টকে তার ক্ষমতার সীমা সম্পর্কে সতর্ক করবে।

সব মিলিয়ে, আদালতের এই রায় এটি আবারও প্রমাণ করল যে, যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার ওপরও বিচারিক নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। যে বিতর্কিত ১ লাখ ডলারের ফি নিয়ে পুরো বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হয়েছিল, আদালতের রায়ে তা এখন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিল। মার্কিন শ্রমবাজার ও প্রযুক্তি খাতে এখন প্রত্যাশা একটাই—ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো নীতি প্রণয়ন করা না হয় যা বৈশ্বিক মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। আদালতের এই রায় প্রযুক্তি খাতে এক নতুন দিনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা বিদেশি মেধাবীদের মার্কিন মাটিতে কাজ করার পথকে আরও প্রশস্ত ও সহজতর করবে। এটি কেবল আইন জয়ের লড়াই নয়, বরং মেধা ও প্রযুক্তির বিশ্বায়নের প্রতি একটি বড় ধরনের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com