প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি পর্তুগাল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তি এবং একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ দলটি যখন বিশ্বকাপে পা রাখে, তখন তাদের ঘিরে প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশচুম্বী। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে ১-০ গোলের বেদনাদায়ক পরাজয় পর্তুগিজ ফুটবলে এক গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। এই পরাজয়ের রেশ না কাটতেই পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন রবার্তো মার্টিনেজ। তার এই আকস্মিক পদত্যাগ কেবল একটি দায়িত্বের সমাপ্তি নয়, বরং পর্তুগিজ ফুটবলের একটি বড় অধ্যায়ের অবসান হিসেবে দেখছেন ফুটবলবোদ্ধারা।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মার্টিনেজ তার সিদ্ধান্তের পেছনে অত্যন্ত দৃঢ় যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, তার পর্তুগালে আসার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপ জয়ের মুকুট মাথায় তোলা। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং তার রণকৌশলের ওপর ভিত্তি করে পর্তুগিজ সমর্থকরাও স্বপ্ন দেখেছিল শিরোপা জয়ের। কিন্তু শেষ ষোলো থেকে বিদায়ের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়। স্প্যানিশ এই কোচ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর তার দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার নৈতিক কোনো ভিত্তি নেই। তিনি মনে করেন, ফেডারেশনের উচিত এখন নতুন কোনো পরিকল্পনায় এগিয়ে যাওয়া, যেখানে নতুন কোচের অধীনে দলটি আবারও নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলবে।
মার্টিনেজের সাথে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের চুক্তির মেয়াদ ছিল সোমবার পর্যন্ত। ম্যাচ শেষে তিনি জানিয়েছেন যে, তার চুক্তির মেয়াদ গতকালই শেষ হয়েছে এবং তিনি তা নবায়নের কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তিনি মনে করেন, বোর্ড এবং ফেডারেশনের সভাপতির সামনে এখন নতুন কোচ বেছে নেওয়ার উপযুক্ত সময়। মার্টিনেজের অধীনে পর্তুগাল দল বেশ কিছু ভালো মুহূর্ত পার করেছে, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে লড়াই করেছে, তবে সাফল্যের শেষ সিঁড়িটি আর স্পর্শ করা হয়নি। এই হার কেবল কোচের বিদায় নয়, বরং দলের মূল খেলোয়াড়দের অনেকের জন্য এটি ছিল নিজেদের শেষ বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করার লড়াই।
খেলোয়াড় হিসেবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পর্তুগালের ফুটবলে যে উচ্চতা তৈরি করেছেন, তার পরিপূরক হিসেবে একটি শিরোপা জয়ের আক্ষেপ সবসময়ই থেকে গিয়েছিল। মার্টিনেজের অধীনে সেই আক্ষেপ ঘোচানোর প্রচেষ্টা ছিল প্রাণান্তকর। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে পর্তুগাল শেষ পর্যন্ত খেই হারিয়ে ফেলে। মার্টিনেজ জানিয়েছেন, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তার এমন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না যে তিনি পদত্যাগ করবেন। তিনি চেয়েছিলেন পূর্ণ মনোযোগ নিয়ে শিরোপা জয়ের পথে এগিয়ে যেতে। কিন্তু মাঠের ফলাফল যখন অনুকূলে আসেনি, তখন তিনি খেলোয়াড় এবং ফেডারেশনের সম্মানের খাতিরে দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই শ্রেয় মনে করেছেন।
ফুটবল কেবল ১১ জন খেলোয়াড়ের খেলা নয়, এটি একটি দেশের আবেগ ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। পর্তুগালের মতো একটি আবেগপ্রবণ ফুটবলপ্রধান দেশের জন্য বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়াটা সবসময়ই কঠিন। মাঠের লড়াইয়ে স্পেনের কৌশলের কাছে হেরে যাওয়া পর্তুগালের সমর্থকরা এখন নিস্তব্ধ। মার্টিনেজের বিদায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় পর্তুগিজ ফুটবল অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে তার এই দায়িত্ববোধের প্রশংসা করছেন, আবার অনেকে মনে করছেন দলের পুনর্গঠনের জন্য মার্টিনেজের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। তবে মার্টিনেজ নিজেও অবগত যে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের কোচিং মানেই হচ্ছে ফলাফলের ওপর নির্ভর করা। ফলাফল না এলে কোনো অজুহাতই শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকে না।
পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন এখন নতুন করে ভাবছে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা নতুন কোচের নাম ঘোষণা করতে পারে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে মার্টিনেজের এই শূন্যস্থান পূরণ করা সহজ হবে না। তিনি যে শৃঙ্খলা ও আধুনিক ফুটবল দর্শনের ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছেন, তা পর্তুগালের পরবর্তী কোচকে এগিয়ে নিতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে। মার্টিনেজ তার বিদায় বার্তায় সকল খেলোয়াড়, সাপোর্ট স্টাফ এবং পর্তুগিজ সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, পর্তুগালের জার্সি গায়ে যারা খেলেছেন, তাদের ত্যাগ ও পরিশ্রমের কথা তিনি সবসময় স্মরণ রাখবেন।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই ম্যাচটি ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে একটি ব্যর্থতার গল্প হিসেবে, কিন্তু মার্টিনেজের বিদায় সেই গল্পের এক করুণ পরিণতি যোগ করল। তিনি প্রমাণ করলেন যে, পরাজয় স্বীকার করার মতো সততা এবং নিজের ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরে দাঁড়ানোর মতো ব্যক্তিত্ব তার আছে। এখন সময়ের অপেক্ষা, পর্তুগাল ফুটবল কীভাবে তাদের এই পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলে আবার নতুন উদ্যমে বিশ্বমঞ্চে ফিরতে পারে। ফুটবলের এই অনিশ্চিত যাত্রায় মার্টিনেজ হয়ে রইলেন এক ট্র্যাজিক হিরো, যার লক্ষ্য ছিল অনেক বড়, কিন্তু গন্তব্য শেষ হলো মাঝপথে।
ফুটবল প্রেমীদের কাছে মার্টিনেজের এই পদত্যাগ এক বড় চমক হিসেবেই এসেছে। কারণ তিনি যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন তার হাত ধরে পর্তুগাল এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়ায় তিনি নিজে থেকেই সরে দাঁড়িয়েছেন, যা তার নৈতিক অবস্থানের পরিচয় দেয়। পর্তুগাল দলের ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েই শেষ হলো মার্টিনেজের পর্তুগিজ অধ্যায়। এখন নতুন করে সাজানোর পালা, নতুন করে স্বপ্ন দেখার পালা। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন এবং তাদের সমর্থকরা নিশ্চয়ই একটি কার্যকর সমাধান খুঁজবে, যাতে পরবর্তী টুর্নামেন্টে আবারও স্বমহিমায় ফিরতে পারে তাদের প্রিয় পর্তুগাল।