প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগেই ওমান উপকূলের কাছে একটি বিশাল তেলবাহী ট্যাঙ্কারে রহস্যময় নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করার পরপরই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এই হামলার প্রভাব বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যের ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ইউকেএমটিও-এর দেওয়া প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, আক্রান্ত জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকে ওমান উপসাগরের উন্মুক্ত জলসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ওমানের লিমাহ বন্দরের সন্নিকটে পৌঁছামাত্রই জাহাজটির বাম পাশে কোনো এক অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে জাহাজে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, যা জাহাজের নাবিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তবে জাহাজটিতে থাকা নাবিকদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা বা উদ্ধার তৎপরতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ঠিক কী ধরনের অস্ত্র বা প্রজেক্টাইল ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়েও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে।
ইরানের সরকারি টেলিভিশনের দেওয়া তথ্য এই ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার কারণেই এই হামলার শিকার হয়েছে। যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌপথ ব্যবহারের ওপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের অনুমোদিত পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো তাদের নজরদারিতে থাকে এবং সন্দেহজনক কোনো জাহাজে আক্রমণ চালানো তাদের কৌশলগত অবস্থানের অংশ। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতায় এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
হরমুজ প্রণালির এই অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাপ্রবাহকে দায়ী করা হচ্ছে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তা বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতিকে তছনছ করে দিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই বিমান হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশাল শূন্যতা ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। সেই থেকে এই জলপথটি কার্যত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে বাণিজ্যের যে স্বাভাবিক গতি, তা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের জাহাজ চলাচল সীমিত করে ফেলেছে বা দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এতে পণ্যের পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে, যার চূড়ান্ত দায়ভার বইতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। আক্রান্ত জাহাজের আগুনের শিখা যেন বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন কোনো বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী নাবিকরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা কেবল সমুদ্রের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সামরিক সংঘাতের বলি হচ্ছেন। প্রতিটি জাহাজ এখন যেন এক একটি জীবন্ত লক্ষ্যবস্তু। আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এবং বড় বড় রাষ্ট্রগুলো যদি এই পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়, তবে এই প্রণালি অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। জাহাজ মালিকরা এখন বিমা কোম্পানির পক্ষ থেকে উচ্চ ঝুঁকির দাবির মুখোমুখি হচ্ছেন, যা বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ কেবল সীমান্ত বা ভূখণ্ড নিয়ে নয়, বরং এটি শক্তির ভারসাম্যের লড়াই। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি সম্পদ। হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যার হাতে থাকবে, বিশ্বের জ্বালানি রাজনীতির চাবিকাঠি তার হাতেই থাকবে। ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, প্রণালির ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো তাদের নৌ-বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েও এই পথকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওমান উপকূলের এই ঘটনাটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। যদি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধান না আসে, তবে এই জলপথে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা বাড়তে থাকবে। বিশ্বশান্তি রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অবিলম্বে এই প্রণালিকে যুদ্ধমুক্ত এলাকা ঘোষণা করা এবং নিরপেক্ষ তদারকির ব্যবস্থা করা। অন্যথায়, কেবল অর্থনৈতিক বিপর্যয় নয়, এই সংঘাত পুরো বিশ্বকে একটি বড় ধরনের যুদ্ধে টেনে নিয়ে যেতে পারে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং যেকোনো নতুন পরিবর্তনের খবর দ্রুত আপনাদের সামনে তুলে ধরবে।