সাভারে এনসিপির সমাবেশে বোমা হামলা: আহত ৪

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৩ বার
সাভারে এনসিপির সমাবেশে বোমা হামলা: আহত ৪

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আয়োজিত জুলাই পদযাত্রা ও পরবর্তী জনসমাবেশে অতর্কিত বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার রাত পৌনে ১০টার দিকে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত এই সমাবেশে হঠাৎ শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটলে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণে অন্তত চারজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন মো. শাহীন খন্দকার, মো. জসিম, মো. শাহাদাত হোসেন ও ইমরান হোসেন। তাদেরকে দ্রুত উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে একজনের পায়ের আঘাত অত্যন্ত গুরুতর। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠা মাঠজুড়ে তাৎক্ষণিকভাবে হাহাকার আর চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।

ঘটনার সূত্রপাত হয় রাত সাড়ে নয়টার দিকে, যখন এনসিপির পক্ষ থেকে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি পদযাত্রা বের করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের ডাক দিয়ে এই কর্মসূচির আয়োজন করেছিল দলটি। পদযাত্রাটি প্রায় এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তারাপুর ঈদগাহ মাঠে গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে এনসিপির ঢাকা জেলা উত্তরের আহ্বায়ক নাবিলা তাসনিদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় নেতাকর্মীদের বর্ণনায় উঠে আসে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কথা। সমাবেশের মূল আকর্ষণ হিসেবে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের ঠিক আগে নাবিলা তাসনিদ যখন মঞ্চ থেকে কথা বলছিলেন, তখনই হঠাৎ মঞ্চের সামনের দিকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পরপরই চারিদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং আতঙ্কিত মানুষ জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন। মঞ্চে থাকা কেন্দ্রীয় নেতারাও হতভম্ব হয়ে পড়েন। সমাবেশ শুরুর ঠিক আগে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন যে, এটি পরিকল্পিত হামলারই একটি অংশ। তিনি সরাসরি প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা প্রদানে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন।

বিস্ফোরণের পরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সাভারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। নাহিদ ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা ছাড়া জনাকীর্ণ জনসভায় এমন বোমা হামলার ঘটনা ঘটা অসম্ভব। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এ ধরনের ককটেল বিস্ফোরণ বা গুলি চালিয়ে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা থামানো যাবে না। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে তারা এই পদযাত্রা চালিয়ে যাবেন। সাভারের স্থানীয় এমপি ও প্রশাসনের নিরাপত্তার ব্যর্থতাকে দায়ী করে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, যারা সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে, তাদের পরিণতি ফ্যাসিবাদী আমলের মতোই হবে।

ঘটনার পরপরই এনসিপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সাভার মডেল থানার সামনে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। নাহিদ ইসলামসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা থানায় গিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, যদি পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ না করে এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়, তবে ধরে নিতে হবে পুলিশ রাজনৈতিক নির্দেশনায় কাজ করছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের এই অবস্থান সাভারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশ সুপার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, হামলাকারী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং কোনো কিছুই তদন্তের বাইরে রাখা হবে না। সমাবেশের শুরুতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার রহস্যটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগে বিকেলে গাজীপুরের কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ এলাকা থেকে এই জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন নাহিদ ইসলাম। সেখানে তিনি বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পলিসি ও জুলাই সনদের বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সরকারের সাথে জনগণের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে তিনি সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। ঠিক সেই কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় সাভারের এই সমাবেশটি যখন একটি সফল ও বড় গণজমায়েতে রূপ নিচ্ছিল, তখনই এই বোমা হামলার ঘটনা ঘটল।

এই হামলার ঘটনা এখন শুধু একটি আইনি মামলা নয়, বরং এটি জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের উত্তাপ ছড়িয়েছে। এনসিপি এই ঘটনাকে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। স্থানীয় পর্যায়ে জননিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হামলার পেছনে কারা, সেটি এখনও অস্পষ্ট থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। সাধারণ মানুষ ও এলাকাবাসী এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কামনা করছেন।

সাভারের পরিস্থিতি বর্তমানে কিছুটা শান্ত হলেও এলাকায় থমথমে ভাব বিরাজ করছে। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আহতদের স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ভারি হয়ে উঠেছে। মামলার প্রক্রিয়া চলছে এবং ভুক্তভোগী সংগঠনটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, তারা আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। এখন দেখার বিষয়, পুলিশ প্রশাসনের তদন্ত কমিটি কত দ্রুত এই হামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে পারে এবং হামলাকারীদের আইনের মুখোমুখি করতে পারে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই হামলা একটি অশনিসংকেত হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত