প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এক ভয়াবহতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চিহ্ন এখন চারিদিকে। গত মাসের শেষদিকে কারাকাস ও লা গুয়াইরা উপকূলে আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশটির জনজীবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদ আর স্বজন হারানোর বেদনা যেন থামছেই না। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ বহু মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে উদ্ধারকর্মীরা ধারণা করছেন।
গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে কারাকাস, লা গুয়াইরা এবং আশেপাশের জনবহুল এলাকাগুলো মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। বিশাল এই ভূ-কম্পনে প্রায় ৬০ হাজার ভবন হয় পুরোপুরি ধসে পড়েছে, নয়তো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার এক রাতের ব্যবধানে তাদের মাথার ওপরের ছাদ হারিয়েছে। সরকারি হিসাবমতে, অন্তত ১৭ হাজার ৮৫৪ জন মানুষ গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে বা সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঞ্চলের ৮০টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার ৮০০ মানুষ ঠাঁই নিয়েছেন।
আহতদের আর্তনাদে হাসপাতালগুলোর পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। আইনপ্রণেতা জর্জ রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৭৪০ জন ব্যক্তি গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই বিশাল সংখ্যক আহতের চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। পর্যাপ্ত ওষুধ, জরুরি সরঞ্জাম এবং চিকিৎসকের অভাবে অনেক আহতের অবস্থাই সংকটাপন্ন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন। কারাকাসের হোসে গ্রেগোরিও হার্নান্দেজ হাসপাতালের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ইউজেনিয়ো কোভা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে দুর্যোগকবলিত পরিবেশে থাকা মানুষের মধ্যে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
নিরাপদ বিশুদ্ধ পানির অভাব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এখন ভেনেজুয়েলার নতুন সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে লা গুয়াইরা অঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রতিদিন আসছে। জনাকীর্ণ পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অসম্ভব হয়ে পড়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের মধ্যে ব্যাপক মানসিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রিয়জন হারানো এবং সর্বস্বান্ত হওয়ার যন্ত্রণায় বেঁচে থাকা মানুষগুলো এক ভয়ানক ট্রমার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন। এই মানসিক ক্ষত নিরাময় করা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এবং চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া।
ভেনেজুয়েলার এই মহাদুর্যোগের খবর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেশটির জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা এখন একান্ত প্রয়োজন। যদিও দেশীয় উদ্ধারকর্মী এবং সেনাবাহিনী দিনরাত উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের ব্যাপকতা এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে কাজে গতি ধীর হয়ে পড়েছে। খোলা আকাশের নিচে বা অস্বাস্থ্যকর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হাজার হাজার শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত। অপুষ্টি এবং সংক্রামক রোগের ভয়ংকর থাবার হাত থেকে তাদের রক্ষা করাই এখন স্থানীয় প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফুটবলপ্রিয় ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জীবনে শোকের ছায়া কাটছে না। ফুটবল বা অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এখন সবার দৃষ্টি কারাকাসের বিধ্বস্ত রাস্তা আর স্বজন হারানো মানুষগুলোর দিকে। এই ভূমিকম্প কেবল ভবনগুলোকে ধ্বংস করেনি, এটি ধসিয়ে দিয়েছে হাজারো পরিবারের স্বপ্নকেও। বেঁচে থাকা মানুষগুলোর চোখের জলে ভিজে উঠছে মাটির বুক। দেশের স্বাস্থ্যখাতের এই করুণ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা এবং সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। ভেনেজুয়েলার এই দুঃসময়ে বিশ্ববিবেক কতটা সাড়া দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোর জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।