প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তরের হিমালয়কন্যা পঞ্চগড়ের বুক চিরে বয়ে চলা বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এখন কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের নতুন এক সম্ভাবনার কেন্দ্রভূমি। দীর্ঘদিন ধরে এই বন্দরটি মূলত ভারত থেকে পাথর আমদানিনির্ভর হিসেবে পরিচিত থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির পাশাপাশি রফতানি বাণিজ্যে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। বিশেষ করে নেপালের বাজারে বাংলাদেশী পশুখাদ্য ‘সয়াবিন মিল’ রফতানির মাধ্যমে বন্দরটি নতুন গতির সঞ্চার করেছে। গত এক বছরে এই স্থলবন্দর থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়েছে, তা বিগত সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি বার্তা।
সরেজমিনে পঞ্চগড়ের এই বন্দর এলাকা পরিদর্শন করলে দেখা যায়, মহাসড়কের দুপাশ জুড়ে পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি। একদিকে ভারত ও ভুটান থেকে আসা বোল্ডার পাথরের ট্রাকের ব্যস্ততা, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারত ও নেপালমুখী দেশীয় পণ্যের ট্রাকের সরব উপস্থিতি। বন্দর এলাকাটি এখন ২৪ ঘণ্টা কর্মচঞ্চল থাকে। এক সময়ের নিস্তেজ বাংলাবান্ধা বন্দর আজ রফতানিমুখী বাণিজ্যের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ট্রাকে করে ভারত ও নেপালে দেশীয় বিভিন্ন কৃষিপণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য পাঠানো হচ্ছে। রফতানি তালিকায় সয়াবিন মিলের চাহিদাই এখন সবচেয়ে বেশি, যা নেপালের পশুখাদ্য শিল্পের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্যিক এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন ঘটেছে রাজস্ব আয়ের পরিসংখ্যানে। বাংলাবান্ধা কাস্টম হাউসের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে মোট ১৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। গত অর্থবছরে ২৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, সব রেকর্ড ভেঙে আদায় হয়েছে ৪২৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, আগের অর্থবছরের তুলনায় মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বেড়েছে ২৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকারও বেশি। এই অসামান্য অর্জনের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাণিজ্যিক তৎপরতার ব্যাপক প্রসার।
বন্দরের আমদানিকারক, রফতানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা মনে করছেন, এই বন্দরটির বাণিজ্যিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তারা বলছেন, যদি সরকার নতুন নতুন পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান করে এবং বন্দর অবকাঠামো আরও আধুনিকায়ন করা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই বন্দরটি দেশের বৃহত্তম রাজস্ব আহরণকারী স্থলবন্দরের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করতে পারবে। বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, রফতানির পরিধি বাড়ানোর জন্য কাস্টমস প্রক্রিয়ার জটিলতা নিরসন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে আরও নমনীয়তা প্রয়োজন।
বাংলাবান্ধা ল্যান্ডপোর্ট লিমিটেডের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বন্দরের বর্তমান কর্মযজ্ঞের বিষয়ে বলেন, বন্দরটি নানামুখী প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে গেলেও বর্তমানে এর স্বরূপ বদলে গেছে। আগে যেখানে আমদানিই ছিল মূল লক্ষ্য, এখন সেখানে মোট কার্যক্রমের প্রায় ৬০ শতাংশই রফতানিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। এই রূপান্তরটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দেশীয় উদ্যোক্তাদের সদিচ্ছা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে উন্নত বাণিজ্যিক সম্পর্কের সুফল। বন্দর কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা এখন নির্বিঘ্নে তাদের পণ্য রফতানি করতে পারছেন, যা পরোক্ষভাবে সরকারি রাজস্বের পরিমাণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রফতানি বাণিজ্যের এই নতুন জোয়ার কেবল বড় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেই সুফল বয়ে আনছে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে। বন্দরকেন্দ্রিক লোডিং-আনলোডিং, পরিবহন এবং আনুষঙ্গিক সেবার সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষের জীবনে নতুন করে স্বচ্ছলতা ফিরছে। পঞ্চগড়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই বন্দরটি এখন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই বন্দরের কারণে এলাকায় অর্থনৈতিক গতিশীলতা বেড়েছে, যা আগে কখনো কল্পনা করা যায়নি। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত স্টোরেজ সুবিধার দিকে সরকারের নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর কেবল উত্তরবঙ্গের নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে সক্ষম। নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হলে এই বন্দর দিয়ে রফতানির পরিমাণ আরও বাড়বে। বিশেষ করে পাটজাত পণ্যের নতুন বাজার খোঁজা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে রফতানির উদ্যোগ নিলে দেশের রফতানি ঝুড়ি আরও সমৃদ্ধ হবে। সরকারি উদ্যোগ এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর অদূর ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
সবশেষে বলা যায়, গত এক বছরের এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করেছে যে, যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে স্থলবন্দরগুলো দেশের অর্থনৈতিক চাকা ঘোরানোর শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। ২৫৭ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাংলাদেশের রফতানি খাতের ক্রমবর্ধমান শক্তির বহিঃপ্রকাশ। এই ধারা বজায় রাখতে পারলে এবং বাণিজ্যের পথে বাধাগুলো দূর করতে পারলে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই স্থলবন্দরের প্রতিটি উন্নতির ওপর নজর রাখছে এবং দেশের বাণিজ্য বিস্তারে এই বন্দরের অবিস্মরণীয় অবদান আগামীতেও তুলে ধরবে।