প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বাস্থ্যখাতকে আধুনিকায়ন এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার এখন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে সরকারের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার কেবল রাষ্ট্রীয় খাতেই বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করছে। দেশের নেতৃত্ব প্রতিটি সেক্টরে উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করছে এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্যখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার সপ্তাহের সাত দিনই ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে দক্ষ উদ্যোক্তার কোনো অভাব নেই, প্রয়োজন কেবল একটি সহায়ক পরিবেশ ও দূরদর্শী নীতিমালার। অর্থমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, সঠিক সুযোগ-সুবিধা পেলে আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতেই সক্ষম নয়, বরং বিশ্বমানের সাফল্য দেখাতেও সক্ষম হবেন। এই সাফল্যের পেছনে কার্যকর নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম। তিনি তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ করে চিকিৎসা প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। কারণ, বর্তমানে বৈশ্বিক পর্যায়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির বাজার বিপুলভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এতে বাংলাদেশ নিজের জায়গা করে নেওয়ার চমৎকার সুযোগ রয়েছে।
সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতির কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেটে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সরকার মূলত এই খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর আস্থা রাখছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা যাতে স্বল্প সুদে ঋণ এবং ট্যাক্স হলিডের মতো সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কেবল ব্যবসায়িক মুনাফার জন্য নয়, বরং এটি একটি মহৎ মানবিক উদ্যোগ হিসেবেও গণ্য হবে।
আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত জরুরি। দেশে বর্তমানে ছোট-বড় অনেক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠলেও, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলে চিকিৎসা খরচ সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে। এটি যেমন বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি করবে।
মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার দিক থেকে স্বাস্থ্যখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা শুধু মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না। সরকার যে প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম অনেকটাই কমবে। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে বিশেষায়িত কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। স্বাস্থ্য খাতের এই উদ্যোক্তা সম্মেলন মূলত একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার ও গুণগত সেবার মান বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যের উপসংহারে পুনরায় উল্লেখ করেন যে, সঠিক নেতৃত্বের অধীনে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের জন্য যারা এগিয়ে আসবেন, তাদের সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জামের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা থাকা অপরিহার্য। এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগই হবে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। আজকের এই আলোচনা সভা কেবল একটি বৈঠক নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
পরিশেষে, চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা গেলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক নতুন বিপ্লব আসবে। অর্থমন্ত্রীর এই আশার বাণী এবং সরকারের গৃহীত নীতিসমূহ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ চিকিৎসা সরঞ্জাম রফতানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই খাতের সব ধরনের অগ্রগতি ও সরকারি প্রণোদনার প্রয়োগের ওপর নজর রাখছে এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নে সব পক্ষের ইতিবাচক অংশগ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে।