ইরানে মার্কিন হামলা: হরমুজ প্রণালীতে চরম উত্তেজনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
ইরানে মার্কিন হামলা: হরমুজ প্রণালীতে চরম উত্তেজনা

প্রকাশ: ৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারো যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক। দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির বাতাবরণ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এই হামলার পাশাপাশি তেহরানের ওপর তেল বিক্রির লাইসেন্স বাতিল করে অর্থনৈতিকভাবেও কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সংঘাত, কারণ হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়, বরং এটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত কয়েকদিন আগে, যখন হরমুজ প্রণালীতে চলাচলরত তিনটি ট্যাংকারে রহস্যজনক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পরপরই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) কঠোর অবস্থানের কথা জানায়। পবিত্র কোম শহরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোক পালনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরদিনই মার্কিন বাহিনী তাদের এই সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেয়। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করতে ৮০টিরও বেশি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ৬০টিরও বেশি ছোট নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে, যা ছিল মূলত পারস্য উপসাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতার ওপর ইরানের প্রভাব কমানোর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলা ছিল ইরানের অযাচিত আগ্রাসনের একটি জবাব এবং আন্তর্জাতিক নৌপথকে নিরাপদ রাখার অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

তেহরানের পক্ষ থেকে এই হামলাকে ‘প্রকাশ্য আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স হুমকি দিয়েছে যে, এই আচমকা হামলার চরম ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। স্থানীয় সময় বুধবার ভোরে বন্দর আব্বাস, সিরিক, কেশম দ্বীপ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। খার্গ দ্বীপটি ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র, যেখান থেকে প্রতিদিন দেশটির মোট উৎপাদনের ৯০ শতাংশ তেল বিদেশে পাঠানো হয়। যদিও সেন্টকমের প্রাথমিক বিবৃতিতে সরাসরি খার্গ দ্বীপের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিস্ফোরণের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। সিরিকের বাণিজ্যিক জেটিতে হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং সেখানে মাছ ধরার নৌকায় অগ্নিকাণ্ডের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। এছাড়া জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোও ছিল হামলার মূল নিশানা। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দেওয়া। তবে পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এই সামরিক পদক্ষেপ কেবল সামরিক লড়াই নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটকে উসকে দিচ্ছে। গত মাসে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে কিছুটা শান্তির আশা দেখা দিয়েছিল, তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রণালীটির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ তারা বরদাস্ত করবে না।

মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। বন্দরে কর্মরত মৎস্যজীবী, শ্রমিক এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ক্ষেপণাস্ত্রের বিকট শব্দ আর আগুনের লেলিহান শিখা কেবল সামরিক কাঠামোকেই ধ্বংস করছে না, বরং একটি জাতির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকেও ভেঙে দেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে। যুদ্ধের দামামা যখন বেজে ওঠে, তখন কূটনীতির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে এবং সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে বিপন্ন। বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ন্যাটো সম্মেলন বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ট্রাম্পের নীতি ও অবস্থানের দিকেও তাকিয়ে আছে বিশ্ববাসী। তুরস্কের কাছে যুদ্ধবিমান বিক্রি কিংবা মেলোনির সঙ্গে মতবিরোধের মতো ঘটনাগুলো এই পরিস্থিতির ওপর বাড়তি প্রভাব ফেলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ কতদূর গড়াবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। একটি পক্ষ মনে করছে, এটি সীমিত সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে অন্য পক্ষের মতে, এটি বড় কোনো যুদ্ধের প্রারম্ভ হতে পারে।

বর্তমানে পুরো অঞ্চল এক বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তেহরান যদি তাদের হুমকি অনুযায়ী পাল্টা আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন স্নায়ুচাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে এবং আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান খোঁজার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। তবে ক্ষমতার দম্ভে এবং কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে কূটনীতির ভাষা এখন অনেকটাই স্তব্ধ। ইরানের ওপর নতুন করে এই হামলার ঘটনা নিশ্চিতভাবেই আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলবে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত