প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও টানা বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ভয়াবহ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গত তিন দিন ধরে সাগর উত্তাল থাকায় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অলস বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে অর্ধশতাধিক মাদার ভ্যাসেল বা বড় জাহাজ। পণ্য খালাস করতে না পারায় মাদার ভ্যাসেলগুলোর ড্যামারেজ বাবদ প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, যার ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে সৃষ্ট এই সংকট সামাল দিতে গিয়ে শত কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বুধবার পর্যন্ত সেখানে ৫৫টি মাদার ভ্যাসেল নোঙর করে থাকলেও পণ্য খালাসের সুযোগ পেয়েছে মাত্র তিনটি জাহাজ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বহির্নোঙরের বাকি ৫২টি জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যন্ত্রপাতি গুটিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, সোমবার ৫০টি জাহাজের মধ্যে ১৪টি এবং মঙ্গলবার ৪৬টি জাহাজের মধ্যে মাত্র সাতটি জাহাজ পণ্য খালাস করতে পেরেছিল। মূলত সাগরের উত্তাল ঢেউ এবং প্রবল বৃষ্টির কারণে লাইটারেজ জাহাজগুলো মাদার ভ্যাসেলের পাশে ভিড়তে পারছে না। এছাড়া ভারী বৃষ্টিতে খাদ্যশস্য, সার ও সিমেন্ট ক্লিংকারের মতো পণ্যগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় হ্যান্ডেলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম এ বিষয়ে বলেন, বন্দরে মালামাল খালাসের ক্ষেত্রে বৃষ্টির প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যেসব পণ্য যেমন খাদ্যশস্য বা সার বৃষ্টিতে ভিজলে মান গুণ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেগুলোর হ্যান্ডেলিং বৃষ্টির সময় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বন্দরে প্রধান জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো বা কন্টেইনার উঠা-নামা কার্যক্রম মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও বৃষ্টির কারণে ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত যেখানে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার কন্টেইনার ডেলিভারি হয়, সেখানে বুধবার তা দুই হাজার ছয়শ’তে নেমে এসেছে, যা সামগ্রিক সাপ্লাই চেইনকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান জেটিতে বড় জাহাজগুলো ভিড়তে পারে না বলে সেগুলোকে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী-কুতুবদিয়া সংলগ্ন বহির্নোঙরে নোঙর করতে হয়। এরপর ছোট আকৃতির লাইটার শিপের মাধ্যমে মালামাল খালাস করে বন্দরের অভ্যন্তরীণ জেটিতে আনা হয়। বর্তমানে সাগরে তীব্র ঝোড়ো হাওয়া ও উত্তাল ঢেউ থাকায় মাদার ভ্যাসেল ও লাইটার শিপের মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই ঝুঁকি এড়াতে লাইটারেজ জাহাজগুলো দূরে সরে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। বিশাল আকৃতির এই মাদার ভ্যাসেলগুলোকে প্রতিদিন বড় অঙ্কের ড্যামারেজ গুনতে হয়। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. আরিফ জানিয়েছেন যে, ড্যামারেজের পরিমাণ প্রতি জাহাজ ভেদে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এই বিপুল অংকের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপরই প্রভাব ফেলে।
এদিকে বন্দর ও এর আশেপাশের এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বন্দর কেন্দ্রিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে। অনেক পোশাক কারখানার গুদামে পানি ঢুকে পড়ার পাশাপাশি বন্দরে রাখা আমদানি-রফতানিযোগ্য কন্টেইনারগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিজিএমইএ পরিচালক এম মহিউদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় কারখানা থেকে বন্দরে কন্টেইনার পরিবহন বা বন্দর থেকে কাঁচামাল কারখানায় নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক ফ্যাক্টরিতে পানি ঢুকে পড়ার ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং কন্টেইনারে থাকা তৈরি পোশাকের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিটি জেটি ও বহির্নোঙর এলাকায় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাত ও সাগর উত্তাল থাকার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম আরও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত এই পরিস্থিতি উত্তরণে লাইটারেজ জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিকল্প উপায়গুলো সক্রিয় করার দাবি জানিয়েছেন। বন্দরের প্রধান জেটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং গতিশীল রাখার চেষ্টা চললেও বহির্নোঙরে অলস বসে থাকা জাহাজগুলোর কারণে আমদানিকৃত পণ্যের বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা এই জাহাজগুলো কখন আবার স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে প্রকৃতির ওপর।
সাগর উত্তাল থাকা এবং টানা বৃষ্টির কারণে দেশের এই লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শিল্প কলকারখানায় কাঁচামালের সংকট এবং কন্টেইনার ডেলিভারিতে বিলম্বের কারণে উৎপাদন ও রফতানিতে যে ধীরগতি তৈরি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। বন্দরের এই সংকট নিরসনে বন্দর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়িক সংগঠন এবং আবহাওয়া অধিদফতরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে অন্তত গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলো নিরাপদে খালাসের ব্যবস্থা করা যায়।