সর্বশেষ :

সংবিধানে ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিধান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৯ বার
সংবিধানে ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিধান

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো আজ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের চূড়ান্ত অবসান ঘটল। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ সকালে ঐতিহাসিক এই রায় প্রদান করেন, যা দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই রায়কে বহাল রেখেছেন, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালের পথ প্রশস্ত হলো। এই রায় দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রপরিচালনায় জনমতের প্রাধান্যকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করবে।

২০১১ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে দেশে এক নতুন শাসনতান্ত্রিক ধারার প্রবর্তন করেছিল। সেই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা হয় এবং সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বীকৃতি ও জাতীয় চার মূলনীতির পুনর্বহালসহ বিভিন্ন বিধান যুক্ত করা হলেও, এই সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের অধিকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। তখন থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা ও আন্দোলনের ঝড় ওঠে। অনেকের মতেই, এই সংশোধনী ছিল গণতন্ত্রের বিকাশে বড় ধরনের অন্তরায় এবং জনগণের বাক্‌স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা।

২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট বাতিল-সংক্রান্ত ২০ ও ২১ ধারা অবৈধ ঘোষণা করেন। এছাড়া সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদসমূহকেও সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি, নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পৃথক তিনটি আপিল করেছিলেন। সেই আপিলগুলো আজ আপিল বিভাগে খারিজ হওয়ার মাধ্যমে আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্বের জয়জয়কার ঘটল।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গতকাল এক ব্রিফিংয়ে এই সংশোধনীর নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে বলেছিলেন যে, পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল দেশের সংবিধানের কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি বিতর্কিত প্রয়াস। তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই পরিবর্তনের ফলে দেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা, মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা এবং সামগ্রিক অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আজকের রায় সেই রুদ্ধদ্বার খুলে দেওয়ার একটি সাহসী পদক্ষেপ। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে যে কোনো সরকার চাইলেই জনগণের ভোটাধিকার হরণ করতে পারবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পুনর্বহাল হওয়ার মানে হলো, নির্বাচনকালীন সময়ে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার একটি সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ফিরে আসা, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।

এই রায়ের ফলে গণভোটের বিধানটিও সংবিধানে পুনরায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার বিধান থাকলেও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা মুছে ফেলা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতন্ত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ। সংবিধানের কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতের চেয়ে বড় কিছু আর হতে পারে না। এই বিধান ফেরানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ ও মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। আজ বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের রায় ঘোষণার সময় courtroom-এ এক ধরনের থমথমে কিন্তু আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছিল। আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এই রায়কে দেশের সংবিধান রক্ষার এক ঐতিহাসিক বিজয় বলে অভিহিত করা হয়েছে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই রায়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কী হবে? সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করার ফলে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনগুলো একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থাশীলতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে। কারণ, অতীতে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে যে আস্থার সংকট ছিল, তা মূলত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল। এই রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হতে যাচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সংবিধানে ফিরে আসায় দেশের তরুণ প্রজন্ম ও অধিকার সচেতন মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করছেন। গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রের ওপর থেকে মানুষের যে আস্থা কমে গিয়েছিল, এই রায় তা পুনরায় অর্জনের সুযোগ করে দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন করলেই হবে না, বরং এই ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। এই রায় কেবল আইনি জয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জয়। সব মিলিয়ে, আজ বাংলাদেশের সংবিধানে এক নতুন সূর্যোদয় হলো, যা আগামী দিনে একটি সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত