প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং হতাশাজনক হলেও সত্য যে, দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি আধুনিক রাডার স্টেশনের সবকটিই এখন অচল হয়ে পড়েছে। এই বিপর্যয়ের ফলে বাংলাদেশ কার্যত এখন রাডার পর্যবেক্ষণের বাইরে চলে গেছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে যখন দেশজুড়ে ভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত শনিবার ঢাকা অঞ্চলের রাডারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার এই চরম স্থবিরতা পূর্ণতা পেল।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার এবং পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় স্থাপন করা পাঁচটি রাডারই এখন নিথর পড়ে আছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রাডারটি দীর্ঘ আট বছর ধরে অকেজো হয়ে আছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একইভাবে কক্সবাজারের রাডারটি প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ, মৌলভীবাজারের রাডারটিও কয়েক বছর ধরে কার্যকারিতা হারিয়েছে। রংপুরের আধুনিক ডপলার রাডারটি গত বছর সচল করা হলেও গত ১৭ জুন থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবারও তা বন্ধ হয়ে গেছে। রাডারগুলোর এমন ভঙ্গুর দশা এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা মেরামতের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই রাডারগুলোর অনেক যন্ত্রাংশই পুরনো হয়ে গেছে এবং কোনোটির ওয়ারেন্টি মেয়াদের অবসান ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ বাজারে সহজলভ্য না হওয়ায় মেরামত করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, একটি রাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মেরুদণ্ড যে প্রযুক্তি, তার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নে কেন এমন চরম অবহেলা প্রদর্শিত হলো? জাইকার অর্থায়নে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে রংপুরে স্থাপন করা নতুন রাডারটি চালু হওয়ার এক বছরের মাথায় অচল হয়ে পড়া প্রমাণ করে যে, এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনায় গভীর কোনো ত্রুটি রয়ে গেছে। বর্তমানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসকারীরা কেবল স্যাটেলাইট চিত্র এবং গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তাৎক্ষণিক বজ্রঝড় বা আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
বজ্রপাতের প্রবণতা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি থাকা মৌলভীবাজারের রাডারটির অকার্যকারিতা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগণের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনছে। ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের তথ্য সঠিকভাবে সময়মতো না পাওয়ার ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের হাওরগুলোতে ফসলহানি ও মানবিক বিপর্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে কক্সবাজার ও খেপুপাড়ার রাডারগুলো উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একপ্রকার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপ সৃষ্টির সময় এই রাডারগুলোই জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা ও গতিপথ নির্ণয় করে উপকূলবাসীকে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার সময় দেয়। দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই অঞ্চলগুলো রাডার নজরদারির বাইরে থাকায় জেলেরা মাঝ সমুদ্রে চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও আবহাওয়াবিদদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কিছুটা পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব, তবুও রাডার ছাড়া সুনির্দিষ্ট ও তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস দেওয়া অসম্ভব। বিশেষ করে মেঘের অ্যানিমেশন, শিলাবৃষ্টির তীব্রতা এবং বজ্রঝড়ের গতির পরিবর্তন বোঝার জন্য ডপলার রাডারের কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে রাডারের ওপর এই চরম উদাসীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যখন উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্যোগের কয়েকদিন আগেই সঠিক তথ্য পাচ্ছে, তখন আমরা রাডারের মতো প্রাথমিক অবকাঠামো অচল করে রেখে কেবল ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে আছি। এই পরিস্থিতির দায়ভার কার, তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
রংপুর রাডারের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা জাইকা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী তাদের অনুমতি ছাড়া মেরামত করা সম্ভব নয়। এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিদেশি সহযোগিতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের নিজস্ব সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। রাডার স্থাপনের পর দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির অভাব এবং কারিগরি জনবলের অভাব পুরো বিষয়টিকে এক গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় অপেক্ষা করার পর রংপুরে রাডার চালু হলেও তা টেকসই করতে না পারা ব্যর্থতারই এক বড় দৃষ্টান্ত। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য অবিলম্বে খেপুপাড়া ও কক্সবাজারের রাডারগুলো সচল করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
দেশের কৃষি অর্থনীতি, বিমান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত—সবই আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর আকস্মিক বন্যা, বজ্রপাত ও ঝড়ে অগণিত প্রাণহানি এবং ফসলের যে ক্ষতি হয়, তার একটি বড় কারণ তথ্যের অপর্যাপ্ততা। বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত এই সংকটকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা। রাডারগুলো দ্রুত সচল করার জন্য প্রয়োজন বিশেষ বরাদ্দ, দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের সাথে শক্তিশালী সমন্বয়। আমরা কেবল দুর্যোগের সময় সাহসের কথা শুনতে চাই না, বরং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রযুক্তির উপস্থিতি দেখতে চাই।
একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আবহাওয়া রাডারের এই করুণ দশা আমাদের অদূরদর্শিতারই পরিচয় দেয়। প্রকৃতি তার অমোঘ নিয়মে আঘাত হানবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই আঘাত থেকে জাতিকে রক্ষা করার দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রের। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অচল অবস্থা নিরসন করে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ছোটখাটো দুর্যোগও আমাদের জন্য বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাডারের এই স্তব্ধতা আমাদের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত, যা থেকে উত্তরণের পথ দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে।