প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ এবং জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘পঞ্চম জাতিসংঘ পুলিশ প্রধানদের সম্মেলন’ বা ইউএনকপস ২০২৬-এ যোগ দিয়ে তিনি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় এমন আহ্বান জানান। এবারের সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ প্রধান এবং নীতিনির্ধারকগণ অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছেন। বাংলাদেশের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সম্মেলনের প্রথম দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈশ্বিক নিরাপত্তার বর্তমান জটিল সমীকরণ নিয়ে তার বক্তব্যে বলেন, প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ এবং অপরাধী চক্রগুলোর আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কের বিস্তারের ফলে প্রথাগত পুলিশিং ব্যবস্থা এখন আর পর্যাপ্ত নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনি বিশ্বের সব দেশের মধ্যে পদ্ধতিগত জ্ঞান বিনিময়, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে একটি ‘জাতিসংঘ পুলিশ জ্ঞান ও উদ্ভাবন নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের অর্জিত সেরা অনুশীলনগুলো একে অপরের সাথে শেয়ার করতে পারবে, যা সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের এই অঙ্গীকারের কথা পুনরুল্লেখ করেন। তিনি জানান, বিশ্বশান্তি রক্ষায় নিয়োজিত বাংলাদেশ পুলিশের ফর্মড পুলিশ ইউনিটকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সাইবার অপরাধ তদন্ত বিশেষজ্ঞ এবং ফরেনসিক খাতের মতো আধুনিক শাখাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ তার কর্মদক্ষতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। ইন্টেলিজেন্স-লেড পুলিশিং ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম সক্ষমতা সম্পন্ন পুলিশ বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা বিভিন্ন জাতিসংঘ মিশনে প্রশংসিত হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া ছিল জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবেলার উদ্যোগ। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে প্রতি বছর একটি করে ‘পরিবেশ পুলিশিং সম্মেলন’ আয়োজনের প্রস্তাব রাখেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা ঝুঁকি, অভিবাসন সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো জটিল বিষয়গুলো নিরসনে এই সম্মেলন বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এমন একটি অভিযোজনক্ষম ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ জাতিসংঘ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, যারা কেবলমাত্র নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে নয়, বরং মানবতার রক্ষক হিসেবেও নিজেদের নিয়োজিত রাখবে।
দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় তিনটি মূল প্লেনারি সেশনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘জাতিসংঘ পুলিশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা’, ‘জাতিসংঘ পুলিশিংয়ে উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তি’ এবং ‘আন্তঃদেশীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া দূরদর্শী প্রস্তাবগুলো এই সেশনগুলোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্বনেতাদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিভিন্ন দেশের পুলিশ প্রধানদের উপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের নিরাপত্তা যখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন হুমকি—যেমন সাইবার সন্ত্রাসবাদ, মানি লন্ডারিং ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের সম্মুখীন হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই সাহসী প্রস্তাবনাগুলো বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন দিশা দেখাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কেবল শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য পাঠিয়েই ক্ষান্ত থাকছে না, বরং আন্তর্জাতিক পুলিশিং ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করা যায়, তার একটি রোডম্যাপও বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অংশগ্রহণ ও সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও সুসংহত করবে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের দেশের অবদানকে আরও গতিশীল করবে।