সর্বশেষ :

সাজা বদল: ইতিহাসের দায় মোচনে রুথ এলিসকে রাজকীয় ক্ষমা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৪ বার
সাজা বদল: ইতিহাসের দায় মোচনে রুথ এলিসকে রাজকীয় ক্ষমা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক দীর্ঘ কলঙ্কিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল সাত দশক পর। ১৯৫৫ সালে নিজের সঙ্গীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্রিটেনের সর্বশেষ নারী রুথ এলিসের সাজা প্রতীকীভাবে পরিবর্তন করেছেন রাজা তৃতীয় চার্লস। বুধবার সরকারের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও সুপারিশের ভিত্তিতে রাজা তার বিশেষ রাজকীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে রুথ এলিসের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করেছেন। এই সিদ্ধান্তটি কেবল একজন ব্যক্তির ইতিহাসের পরিবর্তন নয়, বরং ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার সেই সময়ের কঠোরতা ও ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির এক অনন্য স্বীকারোক্তি। দীর্ঘ ৭০ বছর পর রাষ্ট্র কর্তৃক এই ভুল স্বীকারের ঘটনাটি মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ব্রিটিশ সরকার এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের পেছনে থাকা মূল কারণ হিসেবে ‘ঐতিহাসিক অবিচার’কে চিহ্নিত করেছে। মামলার সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, রুথ এলিস দীর্ঘ সময় ধরে তার সঙ্গীর দ্বারা চরম পারিবারিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার ছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে আদালত যদি এই মামলাটি বিচার করত, তবে নির্যাতনের এই দিকগুলো অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতো। অথচ ১৯৫৫ সালে সেই সময়ে বিচার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং অপরাধের নেপথ্যের মানবিক কারণগুলোকে উপেক্ষা করে কেবল ফলাফলকে কেন্দ্র করেই রায় দেওয়া হতো। বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি তার বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, অতীতে যা ঘটেছে তা হয়তো মুছে ফেলা সম্ভব নয়, কিন্তু বর্তমান সরকার অন্তত এলিসের ওপর হওয়া অন্যায়ের স্বীকৃতি দিতে সক্ষম হয়েছে।

এই রাজকীয় ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়টি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি রুথ এলিসের পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। তার চারজন নাতি-নাতনি বছরের পর বছর ধরে তাদের নানির ন্যায়বিচারের জন্য সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। এর আগে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এলিসের বোন মুরিয়েল ইয়াকুবাইটও আদালতে আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল এলিসের বিরুদ্ধে দেওয়া হত্যার রায়কে পরিবর্তন করে সেটিকে দীর্ঘকালীন নির্যাতনের জেরে উসকানিজনিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। যদিও তৎকালীন সময়ে সেই লড়াই সফল হয়নি, কিন্তু হাল ছাড়েননি পরিবারের সদস্যরা। রাজকীয় এই বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োগে পরিবারটি অবশেষে কিছুটা হলেও মানসিক প্রশান্তি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্রিটেনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে বিতর্কিত ছিল। হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ১৯৬৫ সালে বাতিল করা হলেও, আইনটি কাগজে-কলমে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। ১৯৬৪ সালে সর্বশেষ দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর ব্রিটেনে আর কাউকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। রুথ এলিস ছিলেন সেই দুর্ভাগ্যবান নারী, যার ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। তার সেই ট্র্যাজিক পরিণতি তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজ ও আইনে এক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অথচ আজ সাত দশক পর রাষ্ট্র স্বীকার করল যে, তৎকালীন বিচার প্রক্রিয়ায় মামলার পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা এবং নির্যাতনের চিত্রটি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির ভাষায়, এটি কেবল একটি মানবিক পদক্ষেপই নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার এক নতুন রূপ।

রুথ এলিসের জীবনের শেষ দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো শিহরণ জাগে। একজন সাধারণ নারী, যিনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে এমন এক চরম সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন, তার ওপর কোনো প্রকার সহমর্মিতা দেখানো হয়নি। সমাজ ও আইন উভয়ই তখন ছিল কাঠখোট্টা। অপরাধের বিচার হয়েছিল, কিন্তু অপরাধীর জীবনের পেছনের অন্ধকার দিকগুলো, যা তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছিল, তা আলোচনার বাইরেই থেকে গিয়েছিল। আজকের এই রায় কেবল রুথ এলিসের সম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই নয়, বরং এটি সেই সব নারীর কন্ঠস্বর যারা আজও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নীরবে নিপীড়ন সহ্য করছেন এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। রাষ্ট্র আজ স্বীকার করল যে, নির্যাতন কেবল শারীরিক ক্ষত তৈরি করে না, এটি মানুষের বিচারিক ভাগ্যকেও বিপন্ন করতে পারে।

রাজা তৃতীয় চার্লসের এই বিশেষ রাজকীয় ক্ষমতা ব্যবহারের ঘটনাটি ব্রিটিশ রাজতন্ত্র ও সরকারের মধ্যকার জটিল সম্পর্কের একটি চমৎকার উদাহরণ। ব্রিটেনে রাজা বা রানি বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে ক্ষমা করতে পারেন বা সাজা পরিবর্তন করতে পারেন, তবে এই ক্ষমতা সাধারণত সরকারের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, এটি একটি রাজনৈতিক ও আইনি সমন্বয়ের ফল। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যখন এই ধরণের একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখন তা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে। ভুল স্বীকার করা কেবল দুর্বলতা নয়, বরং তা পরিপক্ক গণতন্ত্রের এক অনন্য গুণ। ব্রিটেন আজ তা প্রমাণ করল।

সবশেষে বলা যায়, ইতিহাসের পাতায় রুথ এলিসের নাম আজও আছে, তবে তার পাশের ‘ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারী’র বিশেষণের সঙ্গে এখন যুক্ত হলো এক ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের গল্প। তিনি হয়তো আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তার নাতি-নাতনিরা আজ মাথা উঁচু করে বলতে পারবেন যে, রাষ্ট্র তার ভুল স্বীকার করেছে। বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এটি এক বড় শিক্ষা—যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে বিচারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। রুথ এলিস হয়তো ন্যায়বিচার পাননি, তবে তার মৃত্যুর ৭০ বছর পর তিনি পেলেন সেই সম্মান, যা রাষ্ট্রের কাছে তার প্রাপ্য ছিল। একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়তে এই ধরণের ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন যে অপরিহার্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত