সর্বশেষ :

শাবিপ্রবিতে ছাত্রদলের সংঘর্ষ: তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৪ বার
শাবিপ্রবিতে ছাত্রদলের সংঘর্ষ: তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা উপভোগকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও মারামারির ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ক্রীড়া উৎসবের আনন্দঘন মুহূর্ত যখন ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষক ও সচেতন শিক্ষার্থীরা।

বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ সেলিম মোহাম্মদ আবদুল কাদির স্বাক্ষরিত এক জরুরি অফিস আদেশের মাধ্যমে এই তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। গঠিত এই কমিটিতে স্কুল অব ফিজিক্যাল সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক মো. আহমদ কবির চৌধুরীকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাসুদ আলম। প্রশাসনিকভাবে এই তিন অভিজ্ঞ শিক্ষকের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত দলকে ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের শনাক্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হল এলাকায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা বড় পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা উপভোগ করছিলেন। খেলা চলাকালীন উত্তেজনার একপর্যায়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়, যা মুহূর্তেই শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়ায় ক্যাম্পাসের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয়ে দিকবিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে এ ধরনের সহিংসতা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই উত্তেজনায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. আহমদ কবির চৌধুরী জানিয়েছেন যে, তারা ঘটনার প্রতিটি দিক অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখবেন। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য উদঘাটন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সংঘাতের নেপথ্যে থাকা প্ররোচনাগুলো বিশ্লেষণ করে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। অপরাধী যেই হোক, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সহিংসতার এই ঘটনায় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সহনশীলতার অভাব ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মারামারি কেবল শৃঙ্খলা পরিপন্থী নয়, বরং এটি ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরে বিদ্যমান অন্তর্দলীয় কোন্দলেরও বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হলো মত বিনিময়ের জায়গা, এখানে সংঘাতের কোনো স্থান নেই। বিশেষ করে যখন গোটা বিশ্ব বিশ্বকাপের জোয়ারে ভাসছে, তখন বিনোদনের উৎসবকে কেন্দ্র করে এমন অরাজকতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরও সজাগ ও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন ত্বরিত পদক্ষেপকে একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তদন্ত কমিটি গঠন কেবল ঘটনার দায়ীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া নয়, বরং ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি নৈতিক লড়াই। অতীতে বিভিন্ন সময় এমন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে দায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, যা ভবিষ্যতে অরাজকতা সৃষ্টির সাহস জোগায়। তাই বর্তমান তদন্ত কমিটি যেন কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, কেবল তদন্ত কমিটি গঠনই নয়, বরং প্রতিবেদনের আলোকে যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ টহল এবং প্রক্টোরিয়াল বডির নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো প্রকার আতঙ্কে না থেকে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছে। শাবিপ্রবি প্রশাসন পুনরায় আশ্বস্ত করেছে যে, ক্যাম্পাসের একাডেমিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখা তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। যেকোনো মূল্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করা হবে। ফুটবল খেলার উন্মাদনা যেন সংঘাতের পথে না নিয়ে যায়, সে বিষয়েও ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন মারামারি নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির সুস্থ ধারা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক বড় সতর্কবার্তা। তদন্ত কমিটির সদস্যরা তাদের দায়িত্বের গুরুত্ব অনুধাবন করে খুব দ্রুত সত্য প্রকাশ করবেন—এমনটাই কাম্য। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ এখন শান্ত। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফিরে পেতে চান তাদের প্রিয় ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক ছন্দ। তদন্ত কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শাবিপ্রবি আবারও তার হারানো স্বচ্ছতা ও শান্তির পরিবেশে ফিরবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত