প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানের প্রশ্নে সোচ্চার খেলাফত মজলিস। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি লন্ডনের স্থানীয় কার্যালয়ে খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য সাউথ শাখার উদ্যোগে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী বৈঠক ও ষান্মাসিক মজলিসে শুরা অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি এবং আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা নিয়ে আয়োজিত এই অধিবেশনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। বিশেষ করে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দেশ গড়ার ক্ষেত্রে নাগরিক প্রত্যাশা নিয়ে এই অধিবেশনে গভীর বিশ্লেষণ করা হয়।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য সাউথ শাখার সভাপতি মাওলানা সাদিকুর রহমান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল করিম মামরখানীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল নেতারা, যাদের মধ্যে রয়েছেন হাফিজ মাওলানা এনামুল হক, হাফিজ শেখ মুশতাক আহমদ, আব্দুল করিম উবায়েদ, মাওলানা আতাউর রহমান জাকির, হাফিজ মাওলানা কামরুল হাসান খাঁন, মাওলানা আব্দুল আহাদ, কাজী মাওলানা আব্দুর রহমান, মাওলানা ফুজায়েল আহমাদ নাজমুল, মাওলানা নুমান উদ্দিন, মাওলানা নুরুল আমীন, মাওলানা জাবির আহমদ এবং মাওলানা আশরাফুল মাওলা ও মাওলানা সাইদুর রহমান প্রমুখ।
অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা সাদিকুর রহমান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর একটি প্রবণতা ছিল ফ্যাসিবাদ কায়েম করার। রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে দুর্নীতি ও লুটপাটের এক অশুভ সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল। বিগত দিনগুলোতে দেশের সম্পদ কীভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে এবং মেগা প্রকল্পের নামে কীভাবে কমিশন বাণিজ্য হয়েছে, তা আজ আর গোপন নয়। দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অবৈধ প্লট, জমি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে এক শ্রেণি নিজেদের আখের গুছিয়েছে, অথচ রাষ্ট্র ছিল ভঙ্গুর।
তিনি আরও বলেন, জাতি এখন এই জঞ্জাল থেকে মুক্তি চায়। সাধারণ মানুষ আগামীর বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বনির্ভর ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, যেখানে আইনের শাসন থাকবে এবং মানুষের ভোটাধিকার থাকবে। দেশের সামগ্রিক কাঠামোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কঠোর হাতে দুর্নীতি দমন করতে হবে। মাওলানা সাদিকুর রহমান জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তার মতে, জুলাই সনদ কেবল একটি দাবি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ফসল। এই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব।
বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্যান্য নেতারাও সমস্বরে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন। তারা বলেন, খেলাফত মজলিস সবসময়ই ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের প্রতিটি সংকটে এগিয়ে এসেছেন এবং ভবিষ্যতে তারা দেশ গঠনে আরও বড় ভূমিকা পালন করতে চান। প্রবাসীরা চান তাদের জন্মভূমি এমন একটি জায়গায় পৌঁছাক যেখানে কোনো দুর্নীতিবাজ বা লুটেরা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে না। খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য সাউথ শাখার এই মজলিসে শুরা অধিবেশন থেকে তারা একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করেন যে, প্রবাসীরা তাদের দাবি আদায়ে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অবিচল।
সংগঠনের নির্বাহী বৈঠকে সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতিশীলতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাউথ শাখার কার্যক্রম কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায় এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও আদর্শিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। নেতারা বলেন, সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই ফ্যাসিবাদবিরোধী আদর্শ প্রচার করা সম্ভব। মজলিসে শুরা অধিবেশনে বিভিন্ন এজেন্ডার ওপর আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আগামী দিনে খেলাফত মজলিস আরও জোরালোভাবে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে উপস্থিত নেতারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দেন। তারা বলেন, প্রবাসীদের অর্জিত মেধা ও জ্ঞানকে কীভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। যদি সঠিক পথে সম্পদ আহরণ এবং তার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়, তবেই বাংলাদেশ দ্রুত একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদায় উপনীত হবে। খেলাফত মজলিসের নেতারা তাদের বক্তৃতায় বারবার জুলাই সনদের কথা উল্লেখ করেন এবং এই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পরিশেষে, এই ষান্মাসিক মজলিসে শুরা অধিবেশন থেকে এক নতুন দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। সংগঠনের নেতারা বলেন, অতীতে যারা দেশ ধ্বংস করেছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে যারা নতুন করে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, তাদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য সাউথ শাখা মনে করে, কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই নয়, বরং প্রতিটি স্তরে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গঠন সম্ভব। তাদের এই বার্তাটি যেন কেবল তাদের শাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।