সর্বশেষ :

ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনি হত্যায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ বার
ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনি হত্যায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় সংঘটিত শিশু নিছামনি হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে এক গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। এই পৈশাচিক ঘটনার মাত্র পঁচিশ দিনের মাথায় বিচারিক আদালত যে দৃষ্টান্তমূলক রায় ঘোষণা করেছেন, তা ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে থাকবে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়মনসিংহের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সুদীপ্তা সরকার এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। একইসাথে, অপর এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ দশ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে একটি অবুঝ শিশুর করুণ মৃত্যুর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথে বড় এক ধাপ অতিক্রম করল রাষ্ট্র।

মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১৪ জুন বিকেলে ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনিকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়। নিছামনির মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর এমন পরিণতির কথা শুনে স্থানীয় এলাকাবাসী থেকে শুরু করে গোটা দেশ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। পরদিন ১৫ জুন নিছামনির বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ধোবাউড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে নামে পুলিশ এবং দ্রুততম সময়ে চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পুলিশের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মুখে আসামিরা তাদের অপকর্মের কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি প্রদান করে। মামলার গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় পুলিশ মাত্র নয় দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৩ জুন চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

বিচারিক প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত ও গতিশীল। মামলার বিচারকাজ চলাকালীন সময়ে মাত্র কয়েক দিনে ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা এই মামলার প্রতিটি ধাপে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর বজলুল করিম চৌধুরী রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ সঠিকভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে এবং চরম পাশবিকতায় নিছামনিকে হত্যা করেছে। এই ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমেই সমাজে আইনের শাসন বজায় রাখা সম্ভব। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরকার জানিয়েছেন যে তারা এই রায়ে সন্তুষ্ট নন। তার দাবি, পুলিশ আসামিদের কাছ থেকে জোরপূর্বক জবানবন্দি নিয়েছে এবং তারা উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

নিছামনির বাবা-মা ও স্বজনরা আদালতের রায় ঘোষণার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের বুকের ধন হারানোর বেদনা কোনো বিচারই পুরোপুরি মুছে দিতে পারবে না, তবুও এই রায়ে তারা কিছুটা হলেও শান্তি পেয়েছেন। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন যাতে আর কোনো শিশুর ভাগ্যে এমন নিষ্ঠুর পরিণতি না ঘটে। বিচারক সুদীপ্তা সরকার রায় ঘোষণার সময় নিছামনি হত্যার ভয়াবহতার ওপর আলোকপাত করেন এবং সমাজের জন্য এই রায়কে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেন। অপরাধের বিচার যদি এভাবে দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে সম্পন্ন হয়, তবে অপরাধীরা কোনোভাবেই পার পাওয়ার সুযোগ পাবে না।

এই ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন আরিফ মিয়া, হাসান রাকিব এবং আবু সাইম। তাদের সবার বয়সই আঠারো থেকে বিশের কোঠায়। অন্যদিকে মারুফ নামক অপর আসামি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরাধের ধরণ এবং এর ভয়াবহতা বিবেচনায় আসামিদের এই শাস্তি ন্যায়বিচারের দাবি পূরণ করেছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। কোনো শিশু যখন রাষ্ট্র বা সমাজের কারো দ্বারা এমন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সেই বিচারটি দ্রুত সম্পন্ন হওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। ধোবাউড়ার এই ঘটনাটি সেই দায়িত্ব পালনের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ময়মনসিংহের বিচারিক অঙ্গন থেকে আসা এই রায়টি কেবল একটি হত্যা মামলার সমাপ্তি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিজ্ঞ বিচারকদের দ্রুত শুনানি ও রায় প্রদান—এই সবকিছুর সমন্বয় ছিল নিছামনি হত্যা মামলার বড় বৈশিষ্ট্য। পঁচিশ দিনের ব্যবধানে মামলার রায় ঘোষণা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগ প্রমাণ করেছে যে, কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। শিশু নিছামনির অকাল প্রস্থান আমাদের সমাজকে যে কালো দাগে কলঙ্কিত করেছিল, বিচারক সেই কলঙ্ক মোচনের পথ প্রশস্ত করেছেন।

পরিশেষে, নিছামনি হত্যা মামলার এই রায় শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে। আমরা আশা করি, উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকলেও অপরাধীদের এই কঠোর শাস্তি অপরিবর্তিত থাকবে এবং দ্রুত রায় কার্যকর করা হবে। সমাজে যেন নিছামনির মতো আর কাউকে এভাবে প্রাণ দিতে না হয়, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে এবং অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। এই রায় কেবল নিছামনির পরিবারের সান্ত্বনা নয়, এটি গোটা জাতির প্রত্যাশার প্রতিফলন। আমরা চাই প্রতিটি শিশুই নিরাপদে বেড়ে উঠুক এবং আমাদের বিচার বিভাগ এভাবেই সর্বদা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখুক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত