প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থা যে চালকবিহীন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে যাচ্ছে, তা আরও একবার প্রমাণ করল গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের স্বচালিত গাড়ি বিভাগ ওয়েমো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় গাড়ি প্রযুক্তির জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও চারটি নতুন শহরে তাদের রোবোট্যাক্সি সেবা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সান ডিয়েগো, লাস ভেগাস, ট্যাম্পা এবং ডেনভার শহরের রাজপথে দেখা যাবে এই চালকবিহীন যানগুলো। প্রাথমিকভাবে এই সেবাটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই সাধারণ মানুষের জন্য তা সহজলভ্য করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে যে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব, ওয়েমোর এই সম্প্রসারণ সেটিরই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের দশটিরও বেশি শহরে ইতিমধ্যে সফলভাবে রোবোট্যাক্সি পরিচালনা করছে ওয়েমো। তাদের প্রযুক্তির ওপর মানুষের আস্থা ও নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। মার্কিন সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস পর্যন্ত ওয়েমোর বহরে প্রায় ৪ হাজার চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি রয়েছে। এই গাড়িগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের উদ্ভাবিত পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের স্বয়ংক্রিয় চালনা প্রযুক্তি, যা গাড়িগুলোকে ট্র্যাফিক সিগন্যাল, পথচারী এবং রাস্তার জটিল পরিস্থিতির সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে মানিয়ে নিতে সহায়তা করে। ওয়েমো জানিয়েছে যে, এখন পর্যন্ত তাদের এই চালকবিহীন গাড়িতে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রায় ২ কোটিরও বেশি সফল যাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। তাদের লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী—এই বছরের শেষ নাগাদ প্রতি সপ্তাহে ১০ লাখ যাত্রা সম্পন্ন করার মাইলফলক স্পর্শ করা।
অবশ্য এই অগ্রযাত্রার পথটি পুরোপুরি কণ্টকমুক্ত নয়। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিকাশে ওয়েমোকে বিভিন্ন সময় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সাম্প্রতিক ভারি বৃষ্টিপাতের সময় কয়েকটি গাড়ি পানির তোড়ে আটকে পড়ার ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে সান ফ্রান্সিসকোর রাস্তায় ব্যাপক যানজটে পড়ে বেশ কিছু গাড়ির ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ার বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়েছে তাদের। এমনকি একটি গাড়ির আতশবাজির দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো অদ্ভুত পরিস্থিতির ঘটনাও গণমাধ্যমে এসেছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের তৈরি করা জটিল বাস্তবতাকে পুরোপুরি বুঝতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাজারে ওয়েমো একা নয়। টেসলা এবং জুকস-এর মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোও সমান তালে তাদের প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে নতুন নতুন শহরে সেবা বিস্তারের প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে। তবে বিশাল আর্থিক ভিত্তি এবং অ্যালফাবেটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টি প্রতিষ্ঠানের সমর্থন থাকায় ওয়েমো অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তারা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করেছে। এ বছরের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের রাস্তায় প্রথম আন্তর্জাতিক রোবোট্যাক্সি সেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এটি সফল হলে বিশ্বজুড়ে চালকবিহীন প্রযুক্তির এক নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।
মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি ওয়েমোর প্রযুক্তির প্রধান ভিত্তি। তারা দাবি করছে যে, মানুষের ভুল বা ক্লান্তিজনিত কারণে সড়ক দুর্ঘটনার যে হার, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে তা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। গাড়িগুলোতে বসানো শক্তিশালী সেন্সর ও ক্যামেরা সিস্টেম সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে যেকোনো বিপদ শনাক্ত করতে পারে, যা অভিজ্ঞ ড্রাইভারদের পক্ষেও সব সময় সম্ভব নয়। যখন একটি গাড়িকে চালকহীন অবস্থায় দেখা যায়, তখন তা প্রথমে কৌতূহল সৃষ্টি করলেও এখন আমেরিকানদের অনেকের কাছেই এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। সাশ্রয়ী খরচ এবং সহজলভ্যতার কারণে অ্যাপভিত্তিক এই রোবোট্যাক্সি সেবা এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগে মানুষের ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা ওয়েমোর এই কার্যক্রমের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চালকবিহীন এই ট্যাক্সি ব্যবস্থা কেবল একটি পরিবহন মাধ্যম নয়, এটি স্মার্ট সিটি বা আধুনিক নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি অন্যতম শর্ত। তবে এই সেবার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে আইনি এবং নৈতিক বিতর্কও সমানভাবে চলছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার দায়ভার কার ওপর বর্তাবে এবং প্রযুক্তির ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে চিন্তার ভাঁজ রয়েছে। ওয়েমোসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলো এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে প্রতিনিয়ত তাদের সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা প্রোটোকল আপডেট করছে।
পরিশেষে বলা যায়, চালকবিহীন ট্যাক্সি বা রোবোট্যাক্সির দুনিয়ায় ওয়েমো এখন একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠার পথে। যুক্তরাষ্ট্রের চারটি নতুন শহরে সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমেই তারা প্রমাণ করল যে, তাদের প্রযুক্তি এখন আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে। যদিও জলবায়ু ও রাস্তার পরিস্থিতির মতো ছোটখাটো চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে, তবুও প্রযুক্তির জয়যাত্রা থামিয়ে রাখা অসম্ভব। ওয়েমোর এই অগ্রযাত্রা বিশ্ব পরিবহন ব্যবস্থায় এক বিশাল আমূল পরিবর্তনের বার্তা বহন করছে। হয়তো এমন দিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন প্রতিটি শহরের রাস্তায় চালকবিহীন গাড়িই হবে যাতায়াতের প্রধান ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। ওয়েমোর হাত ধরে বিশ্ববাসী সেই স্মার্ট ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে আছে।