প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
একটি সংকট মুহূর্তে মানুষ নিজের ভেতরের প্রকৃত পরিচয় সামনে নিয়ে আসে। কখনো তা নির্লজ্জ আত্মরক্ষা, কখনো নিঃশর্ত আত্মদান। ২০২৫ সালের সেই বিভীষিকাময় সকালটা, যখন আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছিল রাজধানীর উত্তরার একটি স্কুল ভবনের একটি শ্রেণিকক্ষ, তখন শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—তিনি নিজেকে নয়, তাঁর ছাত্রদের বাঁচাবেন। আর তাই, তিনি রেখেছিলেন সেই কথা, যা তিনি কদিন আগেই অভিভাবকদের দিয়েছিলেন—‘আমার ছাত্রছাত্রীদের কিছু হবার আগে সেটা আমার বুকের ওপর দিয়ে যাবে।’
সেই ভয়াল আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে একে একে ২০টি শিশু যখন তাঁর হাত ধরে, কোলে উঠে অথবা তাঁর শরীর ঘেঁষে নিরাপদে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন মাহেরীন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিলেন একটি জীবন্ত প্রতীক—মানবিকতা, প্রতিশ্রুতি আর আত্মত্যাগের প্রতীক। পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক একটি শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ববান শিক্ষক থেকে অনন্ত ইতিহাস হয়ে ওঠার যাত্রা।
যখন হাসপাতালের আইসিইউতে সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ মোড়া শরীর নিয়ে, জ্বালায় নিস্তেজ দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন স্বামীর দিকে, তখনও তাঁর কণ্ঠ কাঁপে শুধু সন্তানের জন্য নয়—সব সন্তানদের জন্য। প্রশ্ন ছিল—“তুমি বেরিয়ে এলে না কেন?” উত্তর ছিল—“ওরাও যে আমার সন্তান। আমি কথা দিয়েছি।” একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, নিজের জীবনও দিয়ে শিখিয়ে যান কীভাবে কথা রাখতে হয়, কেমন করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া যায়।
মাহেরীনের পরিচয় ছিল না রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা মিডিয়ার আলোতে উজ্জ্বল কোনো সেলিব্রিটির মতো। কিন্তু সেই মুহূর্তে, যখন তাঁর শরীর পুড়ছিল জেট ফুয়েলের ভয়ানক আগুনে, তখন তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের প্রতিটি শিশুর মা, অভিভাবক, রক্ষক। সেই প্রার্থিত মুহূর্তে তাঁর উচ্চারণ—“দৌড়াও, ভয় পেয়ো না, আমি আছি”—এমন এক আশ্বাস হয়ে আছড়ে পড়ে, যা কেবল আগুন থেকে নয়, ভবিষ্যতের সব ভয় থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।
যখন তরুণ কিশোর পাজাকোলা করে বের করে আনে তার নিথর বন্ধুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে, তখন সে পৃথিবীকে জানান দেয়—‘না, সে মারা যায়নি, সে জানতো আমি আসব।’ এই একটি বাক্য কাঁপিয়ে দেয় সভ্যতার মৌলিক অস্তিত্বকে। আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সব হারানোর পরও ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর মানবিকতা থাকলে কিছুই হারায় না।
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের পোড়া মাঠে নিজের বাবাকে খুঁজে বেড়ানো শতভাগ দগ্ধ শিশু, যার পোশাকের ছেঁড়া টুকরাগুলো শরীরে লেপ্টে আছে, যার ব্যথার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সম্মান—সেই শিশুও আজ আমাদের কাছে একজন বীর, বীরশ্রেষ্ঠ। তার পুড়ে যাওয়া পিঠে লেপ্টে থাকা স্কুলব্যাগ আর জলতেষ্টা মেটাতে ব্যর্থ পানির বোতল আমাদের শেখায়—বেঁচে থাকাও কখনো কখনো বিজয়ের সমান।
এই রক্তাক্ত গ্রীষ্মে যখন কিশোর, তরুণ, শিক্ষক ও মায়ের মুখগুলো পোড়া শরীর নিয়ে নীরব চোখে চেয়ে থাকে মৃত্যুর দিকে, তখনও রাষ্ট্রের কোনো দুর্বৃত্ত শক্তি, কতিপয় মদদপুষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা, কিংবা রাজনীতির অলিন্দে ঘোরাফেরা করা পেশাদার বক্তাদের নিঃশব্দতা যেন কিছুতেই আড়াল করতে পারে না মাহেরীনদের ত্যাগকে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া হোক কিংবা নীলফামারীর জলঢাকা—দেশজুড়ে মাহেরীন আর মাসুকা ম্যামের কবরের সামনে ফুল রেখে আসছে হাজারো মানুষ। সেই শ্রদ্ধার অঙ্গনে কোনো পদক, কোনো কাগুজে পুরস্কার কিংবা আনুষ্ঠানিকতা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা নিজেরাই একেকটি ইতিহাস—কথা ও কাজের মিলনের এক নির্ভেজাল উদাহরণ।
এই প্রজন্মের কাছে মাহেরীন ম্যাম আজ একটি জীবনদর্শন। শিখিয়ে গেলেন—কথা রাখাই সবচেয়ে বড় কর্তব্য, মানুষের জন্য আত্মত্যাগের চেয়ে পবিত্র কিছু নেই। তিনি চলে গেলেও প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে, প্রতিটি মায়ের উদ্বিগ্ন মুখে, প্রতিটি শিশুর দৃষ্টিতে তাঁর সাহস আর কোমলতার প্রতিচ্ছবি জ্বলজ্বল করবে।
বাংলাদেশ ক্লান্ত হলে মাহেরীন-মাসুকারা আবার জন্ম নেবেন নতুন পরিচয়ে, নতুন রক্তে, নতুন সাহসে। তাঁরা আমাদের বলেই যাবেন—“দৌড়াও, থেমো না, আমি আছি।”
এখন আমাদের দায়িত্ব, আমরা যেন তাঁর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না করি। এই জাতির তরুণেরা কথা দাও—তোমরাও থামবে না।